ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির ছায়া ও শিক্ষার ভবিষ্যৎ

রাফায়েল আহমেদ শামীম, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ০৪:৪৯ এএম

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যার নামÑ রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ। বিশেষ করে সরকারি দলের যোগ্য-অযোগ্য নেতা-কর্মীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে নিয়োগ এবং শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়াÑ এই দুই প্রবণতা আমাদের শিক্ষার গুণগত মান, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। সমসাময়িক বাস্তবতায় বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক, নৈতিক ও নীতিগত সংকট। প্রথমেই প্রশ্ন আসেÑ কেন সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতির কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়।

বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একটি স্কুল বা কলেজের সভাপতি পদে থাকলে নিয়োগ, উন্নয়ন বাজেট, অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা বিষয়ে প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকে। ফলে এই পদটি স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। দলীয় বিবেচনায় সভাপতি নিয়োগের একটি বড় যুক্তি হলোÑ‘সমন্বয় ও উন্নয়ন।’ ক্ষমতাসীন দলের লোক হলে তিনি সহজে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, উন্নয়ন প্রকল্প আনতে পারেনÑ এমন দাবি করা হয়। বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি সত্যও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এই সুবিধা কি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ও যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে? যখন যোগ্যতার বদলে দলীয় পরিচয় প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, যেখানে শিক্ষা গৌণ হয়ে পড়ে।

গবেষণামূলক দৃষ্টিতে দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়লে তিনটি প্রধান সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, প্রশাসনিক অদক্ষতাÑ কারণ অনেক সভাপতি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা রাখেন না। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিÑ শিক্ষক নিয়োগ, ঠিকাদারি কাজ বা অন্যান্য আর্থিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতার অভাব দেখা দেয়। তৃতীয়ত, শিক্ষার পরিবেশের অবনতিÑ রাজনৈতিক বিভাজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

এখানে শিক্ষকদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকতা একটি পেশা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না; তিনি মূল্যবোধ, চিন্তাভাবনা ও নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলেন। কিন্তু যখন শিক্ষক নিজেই রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন, তখন তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। শ্রেণিকক্ষে তার বক্তব্য, আচরণ ও মূল্যায়নে পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে বহু শিক্ষাবিদ মনে করেনÑ শিক্ষকদের সক্রিয় দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত। এর মানে এই নয় যে শিক্ষকরা রাজনৈতিক সচেতন হবেন না; বরং তারা হবেন সচেতন, বিশ্লেষণধর্মী ও সমালোচনামুখর নাগরিক। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হলে শিক্ষকতার মূল আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা দেখতে পাই, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলোতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। সেখানে সভাপতি বা গভর্নিং বডির সদস্যরা সাধারণত শিক্ষাবিদ, প্রশাসক বা অভিজ্ঞ সমাজকর্মী হন, যাদের মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন। রাজনৈতিক পরিচয় সেখানে প্রধান বিবেচ্য নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন আনতে হলে কিছু মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি নিয়োগে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতাকে প্রধান মানদ- হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই নিয়োগ নিশ্চিত করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের জন্য একটি আচরণবিধি (ঈড়ফব ড়ভ ঈড়হফঁপঃ) প্রণয়ন জরুরি, যেখানে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ সীমিত করা হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবেÑ যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এককভাবে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ সমাজের ভূমিকা। অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি সমাজ থেকেই জোরালোভাবে আসতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, শিক্ষা একটি জাতির মেরুদ-Ñ এটি কোনো রাজনৈতিক পরীক্ষাগার নয়। সভাপতি পদে দলীয় লোক বসানো বা শিক্ষকদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়াÑ এই প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি বিভক্ত, দুর্বল ও অনিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠবে। তাই এখনই সময়, আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তার মূল উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে আনিÑ জ্ঞান, মানবিকতা ও নৈতিকতার বিকাশে। শিক্ষাকে যদি সত্যিই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো টেকসই পথ নেই।