ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

রামিসা হত্যার রায় : দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতে ফিরুক জনআস্থা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৬:২৩ এএম

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক অপরাধগুলোর একটি। একটি নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণ, গলা কেটে হত্যা করার মতো পাশবিকতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমন ঘটনায় মানুষ শুধু অপরাধীর শাস্তিই চায় না, রাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি সুস্পষ্ট বার্তাও প্রত্যাশা করে, বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্য অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই।

এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচারপ্রক্রিয়ার দ্রুত অগ্রগতি। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় মামলাটি রায়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তদন্ত, অভিযোগপত্র, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কÑ সব ধাপ দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ার এই গতি প্রমাণ করে, রাষ্ট্র চাইলে আলোচিত ও স্পর্শকাতর মামলাগুলোতে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি কিংবা আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা মামলার সংস্কৃতির বিপরীতে এটি একটি ইতিবাচক উদাহরণ।

তবে দ্রুত বিচারই শেষ কথা নয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলোÑ ন্যায়সঙ্গত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক তথ্য, জবানবন্দি এবং মামলার সব উপাদান পর্যালোচনা করেই রায় দেবেন এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, শিশুধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে আপসহীন। কোনো আইনি ফাঁকফোকর কিংবা কৌশলগত বিভ্রান্তির সুযোগে যেন অপরাধীরা দায়মুক্তি না পায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী ভুক্তভোগীর পরিচিত মানুষ, প্রতিবেশী কিংবা নিকটবর্তী পরিবেশের কেউ। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা আজ শুধু জনসমাগমস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, নিজেদের বাসস্থান ও আশপাশের পরিবেশেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রামিসার হত্যাকা- সেই ভয়াবহ বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জরুরি। শিশু সুরক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের নজরদারি, ভাড়াটিয়া তথ্য সংরক্ষণে কঠোরতা, স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

রামিসা আজ আর নেই। তার ছোট্ট বইয়ের ব্যাগ, স্কুলের খাতা, খেলনা কিংবা অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। যে শিশুটি সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিল স্বাভাবিক একটি দিনের প্রত্যাশায়, সে ফিরেছে নিথর দেহ হয়ে। একটি মায়ের বুক খালি হয়েছে, একটি পরিবারের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে। কিন্তু এই শোক কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো সমাজের, পুরো জাতির।

আমরা এমন এক সমাজ চাই, যেখানে কোনো মা তার সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকবেন না, কোনো শিশুকে পাশবিকতার শিকার হয়ে জীবন দিতে হবে না। রামিসার রক্তের দায় শুধু অপরাধীদের নয়, নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে ব্যর্থ আমাদের সামষ্টিক বিবেকেরও। তাই এই মামলার রায় যেন কেবল একটি আইনি আনুষ্ঠানিকতা না হয়; এটি হোক শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের প্রতিফলন, নৃশংস অপরাধীদের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃঢ় ঘোষণা। জাতি সেই বিশ্বাসের অপেক্ষায় আছে। রাষ্ট্রের কাছে সবার প্রত্যাশা যেন একটাই, এই রায় যেন ন্যায়বিচারের পাশাপাশি মানবতার পক্ষেও একটি স্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

জাতি এখন আদালতের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক, অপরাধীরা তাদের প্রাপ্য শাস্তি পাক এবং এই রায় শিশুধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি কঠোর এবং যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক এটাই প্রত্যাশা ।