ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

মোবাইল ব্যাংকিং খাতের সংকট ও পলিসি সংস্কার

মো. মোজাম্মেল হক মৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৬:২৫ এএম

(গতকালের পর)

এজেন্ট ফাইন্যান্সিংয়ের বৈষম্য ও ক্যাশ-ইন রিওয়ার্ডের ফাঁদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশলেস লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, একজন গ্রাহক যখন এজেন্টের কাছে গিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকান (ঈধংয-ওহ), তখন গ্রাহকের জন্য এটি ফ্রি। কিন্তু কোম্পানিগুলো এই ক্যাশ-ইনের জন্য এজেন্টকে নামমাত্র বা অত্যন্ত কম কমিশন দেয়। এই কম কমিশনের কারণে মাঠপর্যায়ের লাখ লাখ রিটেল এজেন্ট এখন গ্রাহকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বা লুকিয়ে হাজার প্রতি ৪-৫ টাকা ‘ক্যাশ-ইন চার্জ’ ম্যানুয়ালি কেটে রাখছে। কোম্পানিগুলো এটি মুখে নিষিদ্ধ করলেও মাঠপর্যায়ে কোনো তদারকি নেই।

ডিজিটাল ন্যানো লোন ও সুদের অদৃশ্য চড়া হার : বিকাশ বা নগদ এখন সিটি ব্যাংক বা অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জামানতবিহীন ‘ডিজিটাল লোন’ (যেমন ৫০০-২০,০০০ টাকা) দিচ্ছে। এই ঋণগুলোর বাৎসরিক সুদের হার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি বলা হলেও, এগুলো মূলত ৩ মাসের জন্য দেওয়া হয় এবং প্রসেসিং ফি বা সার্ভিস চার্জের নামে এমন কিছু লুকানো খরচ নেওয়া হয়, যা হিসাব করলে বাৎসরিক সুদের কার্যকর হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় এই ডিজিটাল ন্যানো লোনের প্রসেসিং ফির ওপর কোনো কঠোর ক্যাপ বা সীমা না থাকায় কোম্পানিগুলো এর আড়ালে চড়া সুদ ব্যবসা করছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এমএফএস) এবং প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর অদৃশ্য আঘাত:

বর্তমান নীতিমালার এই উচ্চ চার্জ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের ফেসবুক-ভিত্তিক

(ঋ-ঈড়সসবৎপব) এবং ক্ষুদ্র ই-কমার্স নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনে পার্সেন্টেজ হারে উচ্চ চার্জ দিতে হচ্ছে।

সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির সাম্প্রতিক ডেটা সামারি ও গবেষণা অনুযায়ী,* এই বাড়তি খরচের কারণে পণ্যের উৎপাদন ও ডেলিভারি খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা দেশের নতুন স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসীরা যখন দেশে কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স পাঠান, সরকার সেখানে ২.৫% প্রণোদনা দিলেও উচ্চ ক্যাশ আউট চার্জের কারণে সেই প্রণোদনার একটি বড় অংশ কোম্পানিগুলোর পকেটে চলে যায়, যা রেমিট্যান্স গ্রহণকারী প্রান্তিক পরিবারগুলোর প্রকৃত আর্থিক লাভের পরিধি কমিয়ে দিচ্ছে।

অভিন্ন নিয়মের কারণে গ্রাহকদের বাৎসরিক ক্ষতির পরিমাণ :

যদি সামগ্রিকভাবে এমএফএস খাতে দৈনিক ৪,০০০ কোটি টাকা লেনদেন হয় এবং এর ওপর গড়ে ১.৫% হারেও চার্জ (ক্যাশ আউট, সেন্ড মানি, ব্যাংক স্থানান্তর মিলে) হিসাব করা হয়, তবে:

দৈনিক গ্রাহকের পকেট থেকে চলে যাচ্ছে : প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

মাসিক ক্ষতির পরিমাণ : প্রায় ১,৮০০ কোটি টাকা। বাৎসরিক মোট খরচ/ক্ষতি : প্রায় ২১,৬০০ কোটি টাকা। এই ২১,৬০০ কোটি টাকা মূলত দেশের সাধারণ মানুষ, প্রবাসী রেমিট্যান্স গ্রহণকারী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে চার্জ হিসেবে কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা তাদের সঞ্চয় ও মূলধনকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করছে।

উন্নত বিশ্বের মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

উন্নত দেশগুলোতে আমাদের দেশের মতো শতকরা হারে চার্জ কাটা বা এজেন্টভিত্তিক পেমেন্ট মডেলের শোষণ নেই বললেই চলে। সেখানে মোবাইল ব্যাংকিং সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গ্রাহকবান্ধব পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়।

 টাকার অবস্থান ও মালিকানার পার্থক্য:

উন্নত বিশ্বে বিকাশ বা নগদের মতো আলাদা কোনো থার্ড-পার্টি ক্যাশ হোল্ডিং ওয়াটের প্রয়োজন হয় না।

সেখানে গ্রাহকের মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি সরাসরি মোবাইল অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে টাকা মোবাইলের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হলেও তা মূল ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই জমা থাকে এবং গ্রাহক তার ব্যাংকিং রেট অনুযায়ী শতভাগ মুনাফা বা সুদ পান। কোম্পানিগুলোর আলাদাভাবে গ্রাহকের টাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে খাটানোর কোনো সুযোগ থাকে না।

ফ্ল্যাট বা জিরো চার্জ নীতি:

আমেরিকা, ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে টাকা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠাতে কোনো চার্জ কাটে না। যেমন আমেরিকার ‘জেল’ বা ‘ভেনমো’ কিংবা যুক্তরাজ্যের ‘ফাস্টার পেমেন্টস’-এর মাধ্যমে সেকেন্ডের মধ্যে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে টাকা চলে যায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (০ টাকা)। সেখানে শতকরা হারে কমিশন কাটার কোনো সুযোগ নেই।

ক্যাশ আউটের অনুপস্থিতি ও অতিরিক্ত সুবিধা:

উন্নত দেশগুলোতে কাগজের নোট তুলে কেনাকাটার সংস্কৃতি প্রায় নেই। সুপারশপ থেকে শুরু করে ফুটপাতের ছোট দোকান পর্যন্ত সবাই অ্যাপ বা কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট নেয়। যেহেতু ডিজিটাল টাকা ফিজিক্যালি তুলতে বা ক্যাশ রাখতে হয় না, তাই মাঠপর্যায়ের এজেন্টের ওপর তাদের কোনো নির্ভরতা নেই এবং ক্যাশ আউট চার্জের কোনো অস্তিত্বই সেখানে নেই।

উল্টো গ্রাহকের লেনদেনের ট্র্যাক রেকর্ড ভালো হলে অ্যাপের মাধ্যমে তারা তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ঋণ বা ক্রেডিটের সুবিধা পেয়ে থাকেন।

গ্রাহক-বান্ধব ও সুবিধাবৃত্তিক করার জন্য নীতিমালার সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন (১৩টি

সংস্কারের প্রস্তাব) বাংলাদেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (এমএফএস), সাধারণ গ্রাহক এবং সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থে এই ব্যবস্থার কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রয়োজন।

সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির পক্ষ থেকে এবং অর্থনৈতিক জার্নালগুলোর সুপারিশের আলোকে নিচে ১৩টি সুনির্দিষ্ট সংস্কারের প্রস্তাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

ইন্টার-অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশনের পূর্ণ ব্যবহার

যদি একজন বিকাশ গ্রাহক তার ওয়ালেট থেকে সরাসরি যেকোনো ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে নামমাত্র খরচে বা বিনামূল্যে টাকা পাঠাতে পারেন, তবে তাকে ক্যাশ আউট করতে হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বিনিময়’ প্ল্যাটফর্মকে আরও সহজ এবং সম্পূর্ণ ফ্রিতে রূপান্তর করা উচিত, যাতে ক্যাশ আউট করার প্রবণতা কমে এবং ডিজিটাল টাকা ডিজিটাল মাধ্যমেই ঘোরে। ‘এমএফএস ইন্টারেস্ট পলিসি’-এর সংস্কার (টাকা যার, লাভ তার’ নীতি)। বাংলাদেশ ব্যাংককে নতুন সার্কুলার জারি করতে হবে যে, ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টে (ঞঈঅ) জমা থাকা টাকার বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংক যে সুদ বা মুনাফা দেবে, তার সুনির্দিষ্ট ও সিংহভাগ অংশ সরাসরি গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে তাদের দৈনিক স্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসের শেষে ‘ডিজিটাল ইন্টারেস্ট’ হিসেবে জমা করতে হবে। বাকি অংশ কোম্পানিগুলো তাদের অপারেশনাল খরচ হিসেবে রাখতে পারে।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ছাড়

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে ঝগঊ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত (যেমন মাসে ৫০,০০০ টাকা) ক্যাশ আউট সম্পূর্ণ ফ্রি বা সর্বোচ্চ ০.৫% করা উচিত।

ক্যাশ আউট চার্জের ক্যাপ নির্ধারণ

ক্যাশ আউট চার্জ ফ্ল্যাট ১.৮৫% বা ১.৫% না করে একটি স্তরভিত্তিক মডেল করা উচিত। যেমন: ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ক্যাশ আউট চার্জ হবে সর্বোচ্চ ০.৫%, ৫,০০০-২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হবে ১% এবং কেবল বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ১.৫% চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে। এর ফলে প্রান্তিক গরিব মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিশাল আর্থিক ক্ষতি থেকে বেঁচে যাবেন।

‘ডিজিটাল টু ডিজিটাল’ লেনদেন সম্পূর্ণ ফ্রি করা

যেহেতু ‘বিকাশ থেকে ব্যাংক’ বা ‘ব্যাংক থেকে বিকাশ’ কিংবা ‘বিকাশ থেকে নগদ’ লেনদেনে কোনো ফিজিক্যাল ক্যাশ হ্যান্ডলিং বা মাঠপর্যায়ের এজেন্টের প্রয়োজন হয় না, তাই এ ধরনের আন্তঃডিজিটাল লেনদেন সম্পূর্ণ ফ্রি বা সর্বোচ্চ প্রতি ট্রানজেকশনে ফ্ল্যাট ২ টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

শতকরা হিসেবে চার্জ কাটা অবিলম্বে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত।

প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব

বাকিঅংশ আগামীকাল