× UCB Sticker Card
সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আফতাব চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

ভূমিকম্পের ঝুঁকি : সতর্কতার বিকল্প নেই

আফতাব চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৬:৩০ এএম

ভূমিকম্পের ঝুঁকি : সতর্কতার বিকল্প নেই

বিংশ শতাব্দী শেষে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা চমকপ্রদ সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হলেও বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস এবং তা প্রতিরোধের উপায় উদ্ভাবনে এখনো সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি। শুধু ভূমিকম্পের উৎপত্তির কারণ নির্ণয় এবং সম্ভাব্য কোন অঞ্চল ভূমিকম্পে আক্রান্ত হতে পারে সে টুকুই জেনে নেওয়াই সম্ভব হয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকে ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের সীমাহীন চর্চা অব্যাহত। বহুলোকের আজও এ অন্ধবিশ্বাস মনের মধ্যে সদা জাগ্রত রয়েছে যে পৃথিবীটা চারটা বিশালাকৃতি হস্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং ওই হস্তিরা যখন গা নাড়াচাড়া করে ওঠে তখনই পৃথিবীটা কেঁপে ওঠে এবং সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। অবশ্য এসব ধারণার আদৌ কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অনেকে বলেনÑ এসব কুসংস্কার। ভূমিকম্প সৃষ্টির প্রধান কারণ হলোÑ পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরের শিলাখ-ের স্থিতিস্থাপকীয় বিকৃতি। তদুপরি বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্প সৃষ্টির অন্য এক কারণও উদ্ভাবন করেছেন, সেটা হলোÑ জলাশয় বেষ্টিত কম্পন। 

ভারতের মহারাষ্ট্রের শিবাজিসাগর জলাশয়ের সন্নিকটবর্তী অঞ্চলে ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ৬.৫ রিখটার স্কেলের মাপে বেশ কয়েকটা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। বিশ্বের বেশ কিছু জলাশয় অঞ্চল যেমনÑ ভাগরাও লেক (সুইজারল্যান্ড), মারাথান লেক এবং ক্রেমাস্টা লেক (গ্রিস), গ্র্যান্ড ভেল লেক, (ফ্রান্স), লেক মিয়াড (যুক্তরাষ্ট্র), কার্ভিরা লেক (রোডেসিয়া-জিম্বাবুয়ে) ইত্যাদি অঞ্চলে এ রকম ভূমিকম্প হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও আগ্নেয়গিরির উৎপত্তির ফলে চুনাপাথরে দ্রবণ ক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট গহ্বরে স্তর পতনের ফলে ভূমিকম্পের উৎপত্তির সম্ভাবনা থাকে। অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে ভূমিকম্পের সম্পর্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জসহ ফিলিপাইনস অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। ১৮৮৩ সালে জাভার ক্রকাটোয়ায় অগ্ন্যুৎপাতের সঙ্গে ঘন ঘন ভূ-কম্পন হয়েছিল, তবে বেশিরভাগ ভূমিকম্পের মুখ্য কারণ যে ভূ-অভ্যন্তরের সংঘটিত ক্রিয়াকা-ের সঙ্গে সন্নিবিষ্ট সে কথা আজ প্রায় সুনিশ্চিত।

১৯০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিকোতে সংঘটিত প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের পর বিজ্ঞানী মি. এইচএফ রিড শিলাস্তরের স্থিতিস্থাপকতা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেন, যখন শিলাস্তরের নিজস্ব প্রতিরোধী ক্ষমতার ওপর অধিক চাপ সৃষ্টি হয় তখনই সে শিলাস্তর সঞ্চিত চাপ মুক্ত করতে শিলাচ্যুতির মাধ্যমে ভূ-আন্দোলনের সৃষ্টি হয় এবং তখনই ভূমিকম্পের উৎপত্তি ঘটে।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস : ভূমিকম্পের সম্ভাব্য স্থান নির্ণয়ে বিজ্ঞানীরা সক্ষম হলেও ভূমিকম্পের পূর্বাভাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণে এখনো তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণে সক্ষম হননি। তবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য কতকগুলো পন্থার উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেগুলো হলোÑ (ক) ছোট ছোট মধ্যম আকারের ভূমিকম্প বরাবর সংঘটিত হওয়া (খ) প্রাকৃতিক ও গৌ-তরঙ্গের গতিবেগের ব্যবধান (গ) পূর্বে সংঘটিত হয়ে যাওয়া ভূমিকম্পের সময়ের ব্যবধান (ঘ) ভূমিকম্পের পূর্বে নির্দিষ্ট অঞ্চলে ফাটলের সৃষ্টি এবং শিলাস্তরের আয়তন বৃদ্ধি (ঙ) ভূমিকম্পের পূর্বে জীবজন্তুর অস্বাভাবিক আচরণ এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তন। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যানুসারে ভূমিকম্পের পূর্বে ভূগর্ভে অতি মৃদুকম্পন সঞ্চারিত হয়  যা শুধুমাত্র সংবেদনশীল পশুপক্ষীরা অনুভব করতে পারে। তাই ওই সময় ওদের মধ্যে অস্বাভাবিক আচার-আচরণ লক্ষ্য করা যায়।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা : এ কথা স্পষ্ট করে বলা যায় যে, ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস এবং তা প্রতিরোধ করা অতীতের মতো অদূর ভবিষ্যতেও সম্ভব হয়ে উঠবে না। তবে বিজ্ঞানীরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন উপগ্রহ ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে যেভাবে ঝড়-বাদলের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে ঠিক সেভাবেই হয়তো একদিন ভূমিকম্পের পূর্বক্ষণে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তবে ভূকম্পপ্রবণ অঞ্চলের যে দিকচিহ্ন রেখা বিজ্ঞানীরা অংকিত করেছেন আজ অবধি সে দিকচিহ্ন রেখার অভ্যন্তরেই ভূমিকম্প সংঘটিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তাই ভূমিকম্পের করাল গ্রাস থেকে কীভাবে ঘরবাড়ি ও জন-প্রাণী রক্ষা করা যায় সে ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত।

ভারতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এতটাই অপারদর্শী যে ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে প্রাণস্পন্দন খুঁজে বের করতে সুইজারল্যান্ডের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরের সহায়তা নিতে হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বাধা দেওয়ার শক্তি মানুষের নেই কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করা সম্ভব হয় যদি দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য সরকার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রী ও জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসেন এবং এ জন্য জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। এ সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ১৯৯০-২০০০ সালের দশক ‘বিশ্ব প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির হ্রাসকরণ দশক’ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উবপধফব ভড়ৎ ঘধঃঁৎধষ উরংধংঃবৎ জবফঁপঃরড়হ ওউজউ) হিসেবে পালন করা হয়েছিল। ওই দশকে বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিচালন শাখা নিম্নলিখিত উদ্দেশ্যসমূহ নিয়ে গঠন করা হয়। (১) প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দিয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করা (২) প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ (৩) সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা যাতে বাধাগ্রস্ত হতে না পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ (৪) দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই তৎকালীন উদ্ধার ও সাহায্যের কাজে অগ্রসর হওয়া (৫) চিকিৎসা, পানীয়জল, খাদ্য ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা যাতে দুর্যোগ হলে বাধাগ্রস্ত হতে না পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ।

অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে ভূমিকম্পই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি দুর্যোগপূর্ণ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এ ভূমিকম্প অতি কম সময়ের মধ্যে বিস্তর ক্ষতি সাধন করে। ভূমিকম্প কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও শুধু আমাদের সচেতনতা ও সাবধানতার অভাবের ফলেই ভূমিকম্পে এত জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধন হয়। আসাম তথা উত্তর পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশ প্রবল ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল এবং এ অঞ্চলে যেকোনো মুহুর্তে একটা বড় ভূমিকম্প হতে পারে। এমন ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

স্মরণ রাখতে হবে, ১৮৯৭ সালের বড় ভূমিকম্পের পরে আসামে ও সিলেট অঞ্চলে ‘আসাম টাইপ’ ঘরের নির্মাণ শুরু হয়েছিল যা পুরোপুরি ভূমিকম্প প্রতিরোধকারী হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বর্তমান প্রজšে§র লোকেরা ‘আসাম টাইপ’ ঘরের আবশ্যকতা প্রায় ভুলে গেছেন। রুরকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকম্প ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ভূমিকম্পের কম্পন প্রতিরোধকারী ঘরবাড়ি ও সেতু নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে এক বিস্তৃত প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

কিন্তু সাধারণত দেখা যায়Ñ উবাবষড়ঢ়সবহঃ অঁঃযড়ৎরঃু এ কথাগুলো চিন্তাভাবনা না করেই ঘরবাড়ি তৈরির ব্লু প্রিন্টের নক্সার কাগজপত্রের অনুমতি দেয়। ড. মেননের মতে, ১৯৯৯ সালের আগস্ট তুরস্কে হয়ে যাওয়াÑ ভূমিকম্পের চেয়ে ওই বছর সেপ্টেম্ব^রে টার্বাইনে হওয়া ভূমিকম্পে ক্ষতি যথেষ্ট কম। এর একমাত্র কারণ ওই দেশের ঘর, ফ্ল্যাট ইত্যাদি নির্মাণের ক্ষেত্রে নেওয়া কঠোর নিয়ম ও নির্দেশিকা পালন। ২০০১ সালের গুজরাটে ভূমিকম্পে এত ঘর-বাড়ি ধ্বংসের মূলে ছিল ঘর-বাড়ি নির্মাণে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে না চলা। ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করে মহারাষ্ট্রের লাটুর শহরটি ভূমিকম্প প্রতিরোধকারী শহর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। লাটুর জেলাশাসক রাজীব জালোটা ঘর নির্মাণ বিষয়ে গর্ব করে বলেছেনÑ  ‘ঞযবরৎ যড়ঁংবং যধা২৩ব ষরহঃবষ, নবধসং, ফড়সব ংযধঢ়বফ ্ ৎড়ড়ভ, ধহফ ঃযরপশ রৎড়হ হবঃঃরহম রহ ঃযবরৎ পড়হংঃৎঁপঃরড়হ. ঞযরং ডরষষ বহধনষব ঃযবস ঃড় রিঃযংঃধহফ ধ য়ঁধশব ড়ভ বাবহ ংবাবহ ড়হ ঃযব জরপযঃবৎ ঝপধষব.’

ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কায় অযথা আতঙ্কিত না হয়ে যাতে ভূমিকম্পের পরবর্তী দুর্যোগের মোকাবিলায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা প্রয়োজন। বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিধি বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা এবং ভূমিকম্প ডিজাইন না থাকা ঘর-বাড়িগুলো শনাক্ত করে বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করাও উচিত।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!