ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : প্রাপ্তি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিম-লে এক অভাবনীয় ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে। এই সফর কেবল দুটি দেশের মধ্যকার প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন এবং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্নির্ধারণের সাহসী পদক্ষেপ। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে একপেশে ও নতজানু ভাব লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে দিল্লির গ্রিন সিগন্যাল বা সবুজ সংকেত ছাড়া ঢাকার কোনো আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বা শীর্ষ সফর চূড়ান্ত হতো না, সেই বৃত্ত ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে কুয়ালালামপুর-বেইজিংকে বেছে নেওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

কোথায় তাহলে আঘাতটা লেগেছে? জবাব একেবারেই স্পষ্ট। চীন সফরে বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং-এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক এবং সেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে গড়ে ওঠা ঐকমত্য ভারত কোনোভাবেই সোজা চোখে দেখছে না। এ বৈঠক বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘ ৫০ বছরের বঞ্চনা ও আক্ষেপের এক ঐতিহাসিক জবাব হিসেবে আবির্ভূত হলেও ভারতের কাছে এটি গোখরো সাপের দংশনের মতন।

আমাদের জানা আছে যে, উত্তরবঙ্গের অববাহিকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য তিস্তা নদী একইসঙ্গে জীবন এবং মরণখেলা। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে খরা আর বর্ষা মৌসুমে ভারত থেকে ধেয়ে আসা আকস্মিক পানিতে সর্বস্ব হারানোর যে নিষ্ঠুর বাস্তবতা, তা স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই স্থায়ীভাবে সমাধান করতে পারেনি। ভারত গত ৫০ বছরে যে ন্যায্য অধিকার ও পানির নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, চীন সেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার নকশা, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সম্মতি দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে জনআকাক্সক্ষার জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ প্রকল্প নয়, বরং এর গভীর অর্থনৈতিক সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় নদীর দুপাড়ে আধুনিক স্যাটেলাইট শহর, সুপরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থা, উন্নত মৎস্য চাষ প্রকল্প এবং দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার যে স্বপ্ন, তা উত্তরবঙ্গের প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে দেবে। কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে, যার ফলে উৎপাদিত শাক-সবজি ও তরি-তরকারি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ আমিষ ও খাদ্যের চাহিদাই মেটাবে না, বরং তা বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও সুগম করবে। এর ফলে ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত পানি পাওয়ার জন্য ঢাকাকে আর বছরের পর বছর চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হবে না, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক।

তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার সমান্তরালে যে গভীর কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চীনের এই অতি-আগ্রহের মূল চালিকাশক্তি হলো বঙ্গোপসাগরে তাদের প্রবেশাধিকার বা সরাসরি অ্যাক্সেস পাওয়ার আকাক্সক্ষা। চীনের দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মালাক্কা প্রণালির ওপর তাদের একক নির্ভরতা কমানো এবং যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটে বিকল্প রুট তৈরি রাখা। বর্তমানে মিয়ানমারের ওপর চীনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এবং দেশটির সঙ্গে তাদের সরাসরি স্থলসীমান্ত থাকায় মিয়ানমারের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করা বেইজিংয়ের জন্য তুলনামূলক সহজ। কিন্তু মিয়ানমারের চলমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক জান্তা সরকারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান শক্তির উত্থান চীনের এই পরিকল্পনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে চীন বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য এবং স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ করিডর গড়ে তুলতে আগ্রহী। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কোনো সরাসরি সীমান্ত নেই। ফলে এই করিডর বাস্তবে রূপ দিতে গেলে মিয়ানমারের ভূখ- ব্যবহার অপরিহার্য। এখানেই ঢাকার সামনে বড় বড় কূটনৈতিক কয়েকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়; যেমনÑ মিয়ানমারের জান্তা সরকার কি এই করিডরে চূড়ান্ত সম্মতি দেবে, নাকি এর জন্য উদীয়মান শক্তি আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশকে কোনো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ কৌশলগত সমন্বয়ে জড়াতে হবে?

এই জটিল সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান ও সামরিক স্বার্থ। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে সেখানে ওয়াশিংটনের নজরদারি রয়েছে। চীনের অর্থবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থার সিনিয়র বিশ্লেষক চিম লি-র পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য, যেখানে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশকে ঋণ বা অর্থায়নের ক্ষেত্রে চীন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক, হিসেবি ও দূরদর্শী। চীনের মূল ভয় এবং উদ্বেগের জায়গাটি হলো বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভবিষ্যতে এখানে মার্কিন সামরিক বা নৌ উপস্থিতির সম্ভাবনা। মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহযোগিতার সুযোগ যেখানে অত্যন্ত সীমিত, সেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাকে চীন সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিতে পারছে না। ফলে বেইজিংয়ের বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যের ওপর। চীন যদি নিশ্চিত হতে পারে যে বঙ্গোপসাগরে তাদের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে এবং সেখানে মার্কিন সামরিক প্রভাব সীমিত রাখা সম্ভব, তবেই তারা বাংলাদেশে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে আরও বড় ধরনের মেগা প্রজেক্টে অর্থায়ন করতে উৎসাহিত হবে। এই সতর্কতার মাঝে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের চিত্রটি দৃশ্যমান হয়, যেখানে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই চীনের কাছ থেকে ৬.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ নিয়েছে, চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে প্রায় ৭.২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে এবং বেইজিং-ভিত্তিক এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (অওওই) বাংলাদেশকে আরও ২.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক চালের খেলায় বাংলাদেশের ভেতরের জনমানসের মনস্তত্ত্ব এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ভারতের কিছু উগ্র ও জাতীয়তাবাদী নেতার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের মানচিত্র পরিবর্তন করা, কিংবা রংপুর ও সিলেটের অংশ কেটে নেওয়ার যে অবাস্তব ও উসকানিমূলক হুমকি দেওয়া হতো, ভূ-রাজনীতির এই নতুন সমীকরণ সেই দাম্ভিকতার দেওয়ালে এক তীব্র চপেটাঘাত। বাংলাদেশ আকারে ছোট হলেও এর পেছনে এখন যে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে, তা ভারতের একপেশে আধিপত্যবাদী চিন্তাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের মানচিত্র যদি কোনো উসকানির কারণে পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়, তবে তার সুদূরপ্রসারী ধাক্কায় ভারতের নিজস্ব সীমান্ত তথা আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং স্বাধীনতা আন্দোলনগুলো নতুন মোড় নিতে পারে, যা ভারতের অখ-তার জন্য বড় সংকট তৈরি করবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ না করা, ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব এবং পুশইনের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার মতো অন্যায্য আচরণ যতদিন ভারত বন্ধ না করবে এবং সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে প্রতিবেশীকে আপন করে না নেবে, ততদিন বাংলাদেশের জনআকাক্সক্ষায় ভারতকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

ঠিক এই জায়গাতেই চীনের উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব ভারতের তুলনায় বহু গুণ এগিয়ে রয়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছে বেইজিংকে বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য ভরসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্রুত অগ্রগতি দেশের শিল্পায়নকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রক চীন। এমনকি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীন থেকে অত্যাধুনিক ২৪টি জে-১০সিই মাল্টি-রোল ফাইটার জেট কেনার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া দেশের আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি মাইলফলক। ঢাকার এই নতুন ও সাহসী স্ট্র্যাটেজিক চালের ফলেই হয়তো ভারত এখন চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপে পড়ে দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা কার্যক্রম তড়িঘড়ি করে পুনরায় চালু করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠকের পর দেশে ফেরার ঠিক আগের মুহূর্তে ভারতের এই নমনীয় আচরণ এবং ভিসা চালুর সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, কূটনীতিতে শক্তি ও সঠিক কৌশলের প্রদর্শন কতটা জরুরি।

তবে ভুলে গেলে চলবে না, প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক চীন সফর বাংলাদেশের জন্য যেমন বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার এবং সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির দুর্দান্ত বিজয় নিয়ে এসেছে, ঠিক তেমনি এর গভীরে লুকিয়ে থাকা সুদূরপ্রসারী ঝুঁকিগুলোকেও অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ যেন কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের কৌশলগত দাবার ঘুঁটি না হয়ে পড়ে। যেকোনো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঋণের ফাঁদ এড়ানো, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সুনিপুণ ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে আগামী দিনের মূল পরীক্ষা। তবে সমস্ত বাধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্র সুকৌশলে মোকাবিলা করে, নিজেদের সততা ও দেশপ্রেমকে পুঁজি করে বাংলাদেশ যেভাবে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তা আগামী দিনে এক নতুন, আত্মবিশ্বাসী এবং বৈশ্বিক মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলাদেশের অবয়বকেই স্পষ্ট করে তোলে।