ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

তিস্তার পানি বাড়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি

রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ভারি বৃষ্টি ও ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার নিচে নেমে এলেও ভাটিতে পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে উত্তরের পাঁচ জেলার চরাঞ্চলের অন্তত ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব।

তিনি জানান, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের ৪০টি গেট খুলে দেওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত রোববার বিকেলের দিকে গেটগুলো খুলে দেওয়ার পর রাত ১১টা পর্যন্ত তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

এতে উত্তরের পাঁচ জেলা—রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার চরাঞ্চলের অন্তত ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তিনি আরও বলেন, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ জেলায় নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব জেলার ২৬টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

একাধিক পানিবন্দি পরিবারের সদস্যরা জানান, গত দুই দিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও কেউ তাদের কোনো খোঁজখবর নেননি।

সোমবার (২৯ জুন) দুপুর ১২টায় তিস্তার পানি ৫২ দশমিক ০ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়, যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে যেকোনো সময় পানি আবারও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে পাউবো।

এদিকে হঠাৎ করে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গীমারী, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি, কালীগঞ্জের শৈলমারী, চর বৈরাতী, রুদ্রেশ্বর, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন ও স্পারবাঁধ, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা এবং কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা চরাঞ্চলের নদীতীরবর্তী চরের বাদামক্ষেত, ধানের বীজতলা, মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

কালীগঞ্জের কাশীরাম এলাকার বাদামচাষি লোকমান মিয়া জানান, তিস্তার চরে ৭০ শতক জমি লিজ নিয়ে তিনি চিনাবাদামের চাষ করেছেন। কয়েক দিন ধরে পানি জমে থাকায় বাদামে পচন ধরেছে এবং গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কৃষকরা জানান, রাতে পানি কমলেও সকালে আবার বেড়ে যায়। পানি বাড়া-কমার কারণে তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। চলতি মৌসুমে আমন আবাদে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা অনেক বীজতলাও পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে বীজতলা তৈরির প্রয়োজন হতে পারে।

রংপুরের চর চব্বিশ হাজারী গ্রামের কৃষক নজরুল হক বলেন, সোমবার রাত থেকে টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি আরও বাড়ছে। শুনছি ভারত পানি ছেড়ে দিয়েছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে চরাঞ্চলের ধানের চারা, বাদাম ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হবে।

মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক বুলু মিয়া জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। গবাদিপশু ও সন্তানদের নিয়ে তিনি বিপাকে রয়েছেন।

চর রাজপুরের বাসিন্দা আসাদুল বলেন, গত দুই দিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছি। চেয়ারম্যান-মেম্বার কেউ কোনো খোঁজখবর রাখেননি।

রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, তিস্তার মধ্যবর্তী চরের কিছু পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। চেয়ারম্যানদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। তালিকা পেলেই শুকনো খাবার বিতরণ করা হবে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, পানি কখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে আবার কখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি আরও বাড়তে পারে।