বাংলাদেশ আজ উন্নত, সমৃদ্ধ ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল অগ্রগতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে, এই উন্নয়নের ধারাকে টেকসই রাখার জন্য কি আমরা বিশ্বমানের মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পেরেছি? উত্তরটি যতটা আশাব্যঞ্জক হওয়া উচিত ছিল, বাস্তবতা ততটা নয়। কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার ভবন, সেতু কিংবা মহাসড়কে নয়; তার মানুষে। আর সেই মানুষ গড়ে ওঠে শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। তাই আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়, শিক্ষা বদলালেই বদলাবে বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পর শিক্ষা বিস্তারে বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের বেশি। বর্তমানে দেশে সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ১৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজার হাজার কলেজ, প্রায় ২০ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ৬০ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি প্রায় সর্বজনীন হয়েছে এবং ঝরে পড়ার হারও আগের তুলনায় কমেছে। এসব অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু শিক্ষা বিস্তার আর মানসম্মত শিক্ষা এক জিনিস নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে না। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, ইউনেসকো এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লার্নিং ক্রাইসিস বা শেখার সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণি-উপযোগী পাঠ সাবলীলভাবে পড়তে পারে না এবং মৌলিক গণিত দক্ষতায়ও পিছিয়ে থাকে। অর্থাৎ শিশুরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রত্যাশিত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না।
এই দুর্বল ভিত্তির প্রভাব পরবর্তী সর্বস্তরে পড়ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও সেই প্রবণতা পুরোপুরি কাটছে না। গবেষণা, উদ্ভাবন, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে সনদ অর্জনই যেন অনেকের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংগুলোও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের মূল শক্তি গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উদ্ভাবন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তহবিল সীমিত, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা কম এবং গবেষণাগার ও আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হওয়া অনেক শিক্ষার্থী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতি বছর লাখ লাখ স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন কর্মসংস্থান পান না। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল এবং উৎপাদনশিল্পে দক্ষ জনশক্তির অভাবের অভিযোগ নিয়োগদাতারা নিয়মিত তুলে ধরছেন। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে শিক্ষা ও কর্মবাজারের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা, বায়োটেকনোলজি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরে বহু প্রচলিত চাকরির ধরন বদলে যাবে এবং নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও দ্রুত পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমাদের শিক্ষা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য নির্ধারণ করা হয় নম্বর দিয়ে, দক্ষতা দিয়ে নয়। অথচ আধুনিক কর্মক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পায় সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি। এসব দক্ষতা পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করে অর্জন করা যায় না; এর জন্য দরকার অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা, গবেষণা, প্রকল্পভিত্তিক শেখা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা।
শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রথম শর্ত হলো শিক্ষক উন্নয়ন। একজন দক্ষ শিক্ষক একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন। কিন্তু এখনো অনেক শিক্ষক নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না। আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গবেষণামুখী পাঠদানে অধিক বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ মেধা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিক্ষকতাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রমকে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণ, উদ্ভাবন, যোগাযোগ দক্ষতা, নৈতিকতা, পরিবেশ সচেতনতা, আর্থিক জ্ঞান এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (ঝঞঊগ)-এর পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তৃতীয়ত, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট গবেষণা ব্যয় উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। শিল্প খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা বাড়াতে হবে, যাতে গবেষণার ফল সরাসরি অর্থনীতি ও সমাজের উন্নয়নে কাজে লাগে।
চতুর্থত, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি দক্ষ কারিগরি জনশক্তি। অথচ বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার কারিগরি শিক্ষাকে কম গুরুত্ব দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আধুনিক শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তি খাতের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরিতে কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণা অনুদান এবং শিক্ষার গুণগত মান মূল্যায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষায় বিনিয়োগকে কখনো ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান কিংবা আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশও আজ স্মার্ট, উদ্ভাবনী ও উচ্চ আয়ের রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক এবং প্রযুক্তি-সক্ষম নাগরিক। শ্রেণিকক্ষেই সেই নাগরিক তৈরি হয়। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা আর ভবিষ্যতের কোনো কর্মসূচি নয়Ñ এটি আজকের সবচেয়ে জরুরি জাতীয় দায়িত্ব।
সরকার, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক, শিল্প খাত এবং সমাজের সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষাকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় না করে জাতীয় ঐকমত্যের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কারণ শিক্ষার উন্নয়ন কোনো একটি সরকারের সাফল্য নয়; এটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন।
মনে রাখতে হবে, একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার খনিজ, গ্যাস বা অবকাঠামো নয়; তার মানুষ। সেই মানুষকে যদি বিশ্বমানের শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বিশ্বপরিসরেও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে। তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার হওয়া উচিত। শিক্ষা বদলালেই বদলাবে বাংলাদেশ; আর সেই পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে হবে এখনই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন