× UCB Sticker Card
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

সম্পাদকীয়

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট : ঐকমত্য, আস্থা ও গণতন্ত্রের পরীক্ষা

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও  গণভোট : ঐকমত্য, আস্থা  ও গণতন্ত্রের পরীক্ষা

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে আপিল বিভাগের সর্বশেষ রায় নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট-সংক্রান্ত বিধান পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচনি ও সাংবিধানিক কাঠামো নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদসহ কয়েকটি বিধান বাতিলের সিদ্ধান্তও বহাল রয়েছে এই রায়ে। আদালতের এই রায় শুধু একটি আইনি নিষ্পত্তি নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, গণতান্ত্রিক বিতর্ক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে নতুন আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিতর্কিত ইস্যুগুলোর একটি ছিল। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে অবিশ^াস, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে ছিল এই ব্যবস্থা। আপিল বিভাগের রায়ের পর আইনমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। এই ঘোষণা বাস্তবায়ন হলে তা দেশের নির্বাচনিব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে কেবল ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য আইনি কাঠামো, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বাস্তবায়নের আন্তরিকতা।

আদালতের রায়ের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর সব বিধান একযোগে বাতিল না করে অনেক বিষয় জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ সংবিধানের ব্যাখ্যা দিলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছেই রেখেছেন। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এখন সংসদের দায়িত্ব হবে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

গণভোটব্যবস্থা পুনর্বহালের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের মৌলিক প্রশ্নে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত গ্রহণের সুযোগ গণতন্ত্রকে আরও অংশগ্রহণমূলক করতে পারে। তবে গণভোট যেন রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। গণভোটের প্রশ্ন, পদ্ধতি ও প্রয়োগে আন্তর্জাতিক মানদ-, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই ব্যবস্থাও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। 

এই রায়কে বর্তমান সরকার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখছে। আবার বিরোধী দলগুলো একে নিজেদের দীর্ঘ আন্দোলনের সাফল্য হিসেবে দাবি করছে। অন্যদিকে আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সংবিধানকে ‘জীবন্ত দলিল’ হিসেবে উল্লেখ করে সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, কোনো সংবিধানই স্থির ও অপরিবর্তনীয় নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংবিধানকে সময়োপযোগী হতে হয়।

এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক আস্থার সংকট দূর করা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, কেবল সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তন করলেই সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হয় না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীল আচরণÑ এসবই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হলেও যদি এসব উপাদান কার্যকর না হয়, তবে কাক্সিক্ষত ফল অর্জিত হবে না।

সরকার এরই মধ্যে রায়ের আলোকে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন, জনমত যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনের কথা বলেছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে, যদি তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে। আদালতের এই রায় সেই যাত্রাপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু কোনো রায়ই একা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, আইনের শাসন, পারস্পরিক আস্থা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে। তাই এই রায়কে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার অস্ত্র নয়, বরং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করাই হবে রাষ্ট্র ও জাতির জন্য কল্যাণকর। যদি সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়, তবে এটি কেবল সংবিধানের সংশোধন নয়Ñ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি নতুন সূচনাও হয়ে উঠতে পারে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!