× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

পারভেজ খান, সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

এখন সময় ভালোবেসে হাত ধরার

পারভেজ খান, সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৬:৫৬ এএম

এখন সময় ভালোবেসে হাত ধরার

আকাশ যেন থামতেই চাইছে না। মেঘের বুক ফেটে নেমে আসা অবিরাম বৃষ্টি বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদকে আজ এক বিশাল জলরাশিতে পরিণত করেছে। কোথাও পাহাড় ভেঙে পড়ছে, কোথাও নদী ঘরবাড়ি গিলে খাচ্ছে, কোথাও শহরের ব্যস্ত সড়ক পরিণত হয়েছে অচেনা খালে। আর কোথাও কোনো মা ভিজে মেঝেতে কোলে নিয়ে বসে আছেন জ্বরে কাঁপতে থাকা তার শিশুকে নিয়ে। চুলায় আগুন নেই, হাঁড়িতে ভাত নেই, সামনে শুধু পানি আর অনিশ্চয়তা। এ এক নীরব দুর্যোগ। এখানে বন্দুকের শব্দ নেই, বিস্ফোরণ নেই, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের নিরাপত্তা, জীবিকা, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা। রাজধানী ঢাকার অবস্থাও ভয়াবহ। বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় স্থবির জনজীবন। বৃষ্টি  এই জনজীবনে কখনো কখনো আশীর্বাদ হয়ে নামে, কিন্তু এ বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ধসে মৃত্যুর মিছিলকে কি অভিশিাপ ছাড়া আর কিছু বলা যায়? অন্তত আমি বলতে চাই না। আমি আরও বলতে চাই, এখন সময় ভালোবেসে হাত ধরার। সবার হৃদয়ে আজ আবারও বেজে উঠুক সেই গানটি। গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় সুরারোপ করে যে গানটি গেয়েছিলেন শিল্পী ভূপেন হাজারিকা। মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি কি, মানুষ পেতে পারে না, ও বন্ধু। আজকের দিনে এ গানটি কি খুবই প্রাসঙ্গিক নয়? 

বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ দেশের বহু অঞ্চল আজ প্রকৃতির নির্মম পরীক্ষার মুখোমুখি। পাহাড়ি ঢল, নদীর ফুলে ওঠা পানি, অব্যাহত বর্ষণ ও জলাবদ্ধতা মিলিয়ে হাজারো পরিবার ঘরছাড়া। কৃষকের খেত পানির নিচে, জেলের জাল অচল, দোকানির দোকান বন্ধ, দিনমজুরের হাতে কাজ নেই। যাদের প্রতিদিনের আয়ে প্রতিদিনে চুলা জ্বলে, তাদের কাছে একটি বৃষ্টির দিনই কখনো কখনো একদিনের অনাহার।

কিন্তু এই দুর্যোগের সবচেয়ে নীরব কান্না ভেসে আসে রাজধানীর বস্তিগুলো থেকে। সংবাদ শিরোনামে তাদের নাম কম আসে, কিন্তু দুর্ভোগে তারা কারো চেয়ে কম নয়। টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি বিছানায় পড়ে, নোংরা ড্রেনের পানি ঘরে ঢুকে যায়, শিশুরা নোংরা পানিতে দাঁড়িয়ে থাকে, অসুস্থ বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা চিকিৎসাহীন অবস্থায় দিন কাটান। পানি নামলে হয়তো শহর আবার ছুটবে, কিন্তু এই মানুষগুলোর জীবনে থেকে যাবে ঋণ, ক্ষুধা আর অসুখের দীর্ঘ ছায়া।

তাই এ মুহূর্তে শুধু পাহাড়ি জনপদ নয়, শুধু উপকূল নয়Ñ ঢাকার বস্তিগুলোও আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র নিশ্চয়ই তার দায়িত্ব পালন করবে। অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় দুর্গত মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার্থে সর্বোচ্চ সতর্কতা, সমন্বয় এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে মাঠ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য সংস্থা মাঠে কাজ করছে। এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত, আরও দ্রুত এবং আরও সমন্বিত হওয়া দরকার। কারণ দুর্যোগ অপেক্ষা করে না; ক্ষুধা সময় বোঝে না; অসুস্থতা অনুমতি নিয়ে আসে না।

স্বস্তির বিষয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীরাও মাঠে নেমেছেন। কারণ জাতীয় বিপর্যয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় রাজনীতি। এ সময়ে কে সরকারে, কে বিরোধীÑ সেটি বড় প্রশ্ন নয়; বড় প্রশ্ন হলো, কে বিপদে পড়া মানুষের হাত ধরছে।

তবু আমাদের অভিজ্ঞতা সতর্ক হতে শেখায়। বাংলাদেশের দুর্যোগের ইতিহাসে বন্যা যেমন বারবার ফিরে এসেছে, তেমনি ফিরে এসেছে ত্রাণ লুটের লজ্জাজনক ইতিহাসও। প্রকৃত অসহায়ের প্রাপ্য চাল চলে গেছে প্রভাবশালীর গুদামে। ক্ষুধার্ত মানুষের কম্বল বিক্রি হয়েছে বাজারে। তালিকায় উঠেছে সুবিধাভোগীর নাম, বাদ পড়েছে বিধবা, বৃদ্ধ, দিনমজুর আর প্রতিবন্ধী মানুষ। এ অপমান আর চলতে পারে না। স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাইÑ শেয়ালকে মুরগির পাহারা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। দুর্যোগের সময় মানবিক সহায়তা আত্মসাতের চেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধ খুব কমই আছে। একটি শিশুর দুধ চুরি করা, একজন বৃদ্ধের ওষুধ কেড়ে নেওয়া কিংবা ক্ষুধার্ত পরিবারের খাবার আত্মসাৎ করা শুধু দুর্নীতি নয়Ñ এ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।

সরকারকে ত্রাণ বিতরণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিত নজরদারি গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি সহায়তা যেন প্রকৃত মানুষের হাতে পৌঁছায়, সেটিই হতে হবে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার।

কিন্তু এই দুর্যোগের পরেই অপেক্ষা করছে আরেকটি নীরব বিপদÑ রোগ। স্থির পানি মানেই মশার বংশবিস্তার। দূষিত পানি মানেই ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ও নানা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি। শিশু, প্রবীণ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতি আহ্বানÑ আজই প্রস্তুতি নিন। আশ্রয়কেন্দ্রে চিকিৎসক পাঠান, ওআরএস, জরুরি ওষুধ, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন ও মোবাইল মেডিকেল টিম নিশ্চিত করুন। রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর তৎপর হওয়া নয়, আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত সাফল্য।

আর একটি প্রশ্ন আর এড়াতে পারি না। প্রতি বছর একই দৃশ্য কেন? কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই কেন রাজধানী থমকে যায়? কেন শহরের খালগুলো হারিয়ে যায় কংক্রিটের নিচে? কেন ড্রেনগুলো আবর্জনায় ভরে থাকে? কেন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ দখলদারদের হাতে জিম্মি? কেন অপরিকল্পিত নগরায়ণের মূল্য বারবার সাধারণ মানুষকে দিতে হয়?

জলাবদ্ধতা আর কেবল মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি এখন জাতীয় অবকাঠামোগত সংকট। তাই খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জলাধার সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে সরকারের উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। প্রতি বর্ষায় একই অজুহাত শুনে মানুষের ধৈর্য ফুরিয়ে এসেছে।

এই সংকটে আমরা দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, প্রবাসী বাংলাদেশি, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনÑ সবার প্রতি আবেদন জানাই। সাহায্যকে দান হিসেবে নয়, নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখুন। আপনার সামান্য সহায়তাও হয়তো একটি পরিবারকে না খেয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচাবে, একটি শিশুর জীবন রক্ষা করবে, একটি বৃদ্ধের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।

সবশেষে একটি কথাই বলা জরুরি। দুর্যোগের সময় একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি মাপা হয় তার অস্ত্রে নয়, তার মানবিকতায়। একটি জাতির মহত্ত্ব নির্ধারিত হয় সে কত দ্রুত নিজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির পাশে দাঁড়াতে পারে। আজ যারা পাহাড়ে আটকা, যারা উপকূলে পানিবন্দি, যারা ঢাকার বস্তিতে হাঁটুসমান নোংরা পানিতে দাঁড়িয়ে আছেÑ তারা কেউ আমাদের কাছে করুণা চাইছে না। তারা চাইছে শুধু মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ। আসুন, আমরা সেই সুযোগটি নিশ্চিত করি।

সরকার আরও দ্রুত এগিয়ে আসুক। বিরোধী দল মানুষের পাশে থাকুক। প্রশাসন সততার সঙ্গে কাজ করুক। স্বাস্থ্য বিভাগ রোগ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিক। গণমাধ্যম নজরদারি করুক। আর দেশের প্রতিটি মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্তত একজন অসহায় মানুষের হাত ধরুক। কারণ আজ এই দেশকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কোনো স্লোগানের নয়, কোনো কৃতিত্বের নয়, কোনো রাজনৈতিক হিসাবের নয়। আজ এই দেশকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসার। এখন সময়টা ভালোবাসার।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!