ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

সম্পাদকীয়

ডেঙ্গু-হাম প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০১:৪৫ এএম

বর্ষা বাংলাদেশে শুধু স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জও। প্রতি বছরের মতো এবারও ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হতেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার ঘটছে হামেরও। ফলে দেশ এখন একসঙ্গে দুটি সংক্রামক রোগের কবলে। এটি কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বের একটি বড় পরীক্ষা।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে, মৃত্যুও ঘটছে। অন্যদিকে মাত্র চার মাসে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হামের মতো টিকায় প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ এত বড় আকার ধারণ করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এটি টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, নজরদারির দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

ডেঙ্গু ও হাম, দুটি রোগের প্রকৃতি আলাদা হলেও প্রতিরোধের মূল কৌশল অনেকটাই স্পষ্ট। হাম প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র কার্যকর টিকাদান, আর ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায় এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা। অর্থাৎ, শত্রু পরিচিত। এখন প্রয়োজন কেবল পরিকল্পিত, সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর বর্ষা এলে ডেঙ্গু নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়, আবার মৌসুম শেষ হলে সেই উদ্যোগও স্তিমিত হয়ে পড়ে। একইভাবে টিকাদান কর্মসূচিতেও ধারাবাহিকতার অভাব দেখা দিলে তার খেসারত দিতে হয় শিশুদের।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। এডিস মশা কোথায় জন্মায়, কীভাবে বংশবিস্তার করে, এসব তথ্য বহু বছর ধরেই জানা। তারপরও প্রতি বছর একই সংকট ফিরে আসে। কারণ, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি হয় মৌসুমি, পরিকল্পনা হয় খ-িত এবং সমন্বয়ের অভাব থাকে প্রকট। শুধু ফগার মেশিন চালিয়ে বা কয়েক দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন সারা বছরব্যাপী নজরদারি, নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক ভারি বৃষ্টিপাত এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এখনই যদি জমে থাকা পানি অপসারণ, লার্ভা ধ্বংস এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদার না করা হয়, তাহলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাম থেকে শহর, সবখানে হামের টিকাদান কার্যক্রমও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য কখনো শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়, আবার সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। সরকারের কাজ হলো কার্যকর পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে একটি অভিন্ন কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকেও দায়িত্বশীল হতে হবে, শিশুর টিকা নিশ্চিত করা, জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেওয়া।

ডেঙ্গু ও হাম, দুটি রোগই অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য। তবু যদি অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা কিংবা অবহেলার কারণে মানুষের প্রাণহানি ঘটে, তবে তার দায় এড়ানোর সুযোগ কারো নেই। তাই মৌসুমি প্রতিক্রিয়া নয়, প্রয়োজন বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা।

আমরা মনে করি, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে এই দ্বিমুখী স্বাস্থ্য সংকট আরও গভীর হবে।

আমরা আশা করবে, সরকার মানুষের জীবন রক্ষায় দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই দ্বিমুখী স্বাস্থ্য সংকট সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখবে।