দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন এবং সম্ভাবনাময় অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়া সরকার সম্প্রতি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের জন্য যে ১০ দফা কঠোর নীতিমালা বা ‘সিলেকশন ক্রাইটেরিয়া’ ঘোষণা করেছে, তা সাধারণ কর্মীদের জন্য এক বিশাল আশার আলো। এতদিন নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সির সিন্ডিকেটের হাতে বাজার জিম্মি থাকায় সাধারণ কর্মীদের গুনতে হতো অতিরিক্ত টাকা, পোহাতে হতো নানা ভোগান্তি। তবে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ঘোষিত এই নতুন নীতিমালা সেই অচলাবস্থা ভেঙে স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে। আপনি যদি মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখে থাকেন, তবে এই পরিবর্তনগুলো আপনার জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে এবং আপনাকে কী কী বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে, তা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার ও অভিবাসন ব্যয় হ্রাস
দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের প্রধান অভিযোগ ছিল অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়। গুটিকয়েক এজেন্সির একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যেতে হতো। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, অন্য দেশের (যেমন ভারত, নেপাল) মতো বাংলাদেশের সকল যোগ্য ও বৈধ লাইসেন্সধারী এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়া হবে। যখন অনেকগুলো দক্ষ এজেন্সি একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবে, তখন বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এর ফলে দালালদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কর্মীরা অনেক কম খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অভিজ্ঞ ও দক্ষ এজেন্সির নিশ্চয়তা
নতুন নীতিমালার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, একটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রাপ্তির পর অন্তত ৫ বছরের সন্তোষজনক কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং গত ৫ বছরে অন্তত ৩,০০০ কর্মী বিদেশে পাঠানোর রেকর্ড থাকতে হবে। একজন কর্মী হিসেবে এটি আপনার জন্য বড় একটি নিরাপত্তা। কারণ, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারছেন যে আপনার ফাইলটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে আছে যারা এই কাজে অভিজ্ঞ এবং যাদের অতীতে হাজার হাজার মানুষকে বিদেশে পাঠানোর সফল রেকর্ড রয়েছে। এতে ভিসা রিজেক্ট হওয়া বা মাঝপথে প্রক্রিয়া আটকে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
উন্নত প্রশিক্ষণ ও আবাসন সুবিধা
নতুন নীতিমালার ৭ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, এজেন্সির নিজস্ব প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন কেন্দ্র থাকা বাধ্যতামূলক, যেখানে আবাসন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের আধুনিক সুবিধা থাকবে। মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে একজন কর্মীকে সে দেশের ভাষা, সংস্কৃতি এবং কাজের ধরন সম্পর্কে মৌলিক ধারণা (ওহফঁপঃরড়হ সড়ফঁষব) নিতে হয়। এখন থেকে আপনি এজেন্সির নিজস্ব সেন্টারে থেকেই এই প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। এটি কেবল আপনার দক্ষতা বাড়াবে না, বরং বিদেশের মাটিতে গিয়ে দ্রুত কাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেও সাহায্য করবে।
১০ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী অফিস : আপনার আস্থার ঠিকানা
অনেক সময় দেখা যায়, নামসর্বস্ব ছোট ছোট অফিস খুলে দালালরা সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যায়। কিন্তু নতুন নীতিমালায় এজেন্সির জন্য অন্তত ৩ বছর ধরে পরিচালিত ১০ হাজার বর্গফুট আয়তনের স্থায়ী অফিস থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মানে হলো, আপনি যে এজেন্সির কাছে আপনার পাসপোর্ট ও টাকা জমা দিচ্ছেন, তাদের একটি শক্ত অবকাঠামো ও দৃশ্যমান অবস্থান রয়েছে। বড় পরিসরের এই অফিসগুলো কর্মীদের বাছাই ও নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
আইনি সুরক্ষা ও মানব পাচার রোধ
নতুন নীতিমালার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এজেন্সির ‘ক্লিন ইমেজ’।
যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচার, জবরদস্তিমূলক শ্রম বা অর্থপাচারের মতো অপরাধের রেকর্ড আছে, তারা মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনুমতি পাবে না। এমনকি তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ‘সদাচরণের সনদ’ বা ঈবৎঃরভরপধঃব ড়ভ এড়ড়ফ ঈড়হফঁপঃ সংগ্রহ করতে হবে। এতে করে সাধারণ কর্মীরা কোনো অসাধু চক্রের খপ্পরে পড়ার ভয় থেকে মুক্তি পাবেন। আপনার বিদেশ যাত্রা হবে সম্পূর্ণ আইনি ও নিরাপদ।
একজন সচেতন কর্মী হিসেবে আপনার করণীয়
সরকার আগামী ৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের মধ্যে যোগ্য এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেছে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে একটি তালিকা প্রকাশ করা হবে। একজন বিদেশগামী হিসেবে আপনার উচিত হবে:
শুধুমাত্র সরকারি তালিকাভুক্ত এবং ১০ দফা শর্ত পূরণকারী এজেন্সির সঙ্গেই লেনদেন করা।
এজেন্সির নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অফিস সরেজমিনে দেখে আসা।
কোনো প্রকার মৌখিক চুক্তিতে না গিয়ে লিখিতভাবে সকল শর্ত বুঝে নেওয়া।
মালয়েশিয়া সরকারের এই নতুন নীতিমালা
মূলত সাধারণ কর্মীদের স্বার্থ রক্ষার একটি রক্ষাকবচ। এটি কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং হাজারো তরুণের নিরাপদ বিদেশ যাত্রার গ্যারান্টি। সিন্ডিকেটমুক্ত এই নতুন ব্যবস্থায় মালয়েশিয়া যাত্রা হবে সাশ্রয়ী, সম্মানজনক এবং নিরাপদ। সঠিক তথ্য জেনে এবং যোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে পা বাড়ালে আপনার মালয়েশিয়া প্রবাসী হওয়ার স্বপ্নটি হবে নিষ্কণ্টক এবং আনন্দদায়ক।

