ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

নিতে পারেন দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিশারিজ চ্যালেঞ্জ

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ০২:৫১ এএম

দক্ষিণ কোরিয়ার ফিশারি শিল্প বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটির সমৃদ্ধ সমুদ্রসম্পদ, উন্নত অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানির কারণে বিদেশি শ্রমিকদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ‘৩উ’ (উরৎঃু, উরভভরপঁষঃ, উধহমবৎড়ঁং) কাজের ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ফিশারি খাতের প্রধান কাজের সুযোগ রয়েছে মৎস্যচাষ  এবং মাছ ধরা।

মৎস্যচাষে সাধারণত উপকূলীয়, অভ্যন্তরীণ জলাশয় এবং দূরবর্তী সমুদ্রের খামারে মাছ, ঝিনুক, সামুদ্রিক শৈবাল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর চাষ করা হয়। এই খাতে কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে মাছকে খাবার দেওয়া, পানি মান বজায় রাখা, জাল ও নেট পরিষ্কার করা, মাছ সংগ্রহ ও প্যাকিং এবং খামারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা। মৎস্য খামারের কাজ সাধারণত নিয়মিত এবং পরিকল্পিত পরিবেশে হয়, তবে শারীরিক পরিশ্রম অপরিহার্য।

মাছ ধরার ক্ষেত্রে বড় ট্রলার বা ফিশিং বোটে দীর্ঘ সময় ধরে মাছ ধরা, জাল টানা, মাছ বাছাই এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়। এই কাজ শারীরিকভাবে কঠোর, কখনো ঝুঁকিপূর্ণ এবং সমুদ্রের চরম পরিবেশে করা হয়। মাছ ধরার কাজে দীর্ঘ সময় সমুদ্রের মধ্যে থাকতে হয়, ফলে ধৈর্য, শারীরিক সক্ষমতা এবং কঠোর পরিশ্রমের ক্ষমতা অপরিহার্য। তবে কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে বেতন তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে এবং ওভারটাইম থাকলে আয় আরও বৃদ্ধি পায়।

মৎস্য চাষ ও মাছ ধরার ধরন

মৎস্য চাষ : উপকূলীয়, দূরবর্তী জলসীমা এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের ফিশ ফার্মিং-এর

জন্য বিভিন্ন পদে কাজের সুযোগ থাকে। এখানে মাছের পরিচর্যা, খাদ্য সরবরাহ, জাল

মেরামত, ফসল সংগ্রহ এবং খামারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব থাকে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মৎস্য চাষের কাজের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পায়।

মাছ ধরা : দূরবর্তী জলসীমার ফিশিং

ট্রলার বা জাহাজগুলোতে কাজের সুযোগ থাকে। মাছ ধরার কাজ শারীরিকভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। জাল টানা, মাছ বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা ইত্যাদি কাজের সঙ্গে যুক্ত। যদিও ঝুঁকিপূর্ণ, তবে বেতন তুলনামূলকভাবে বেশি এবং ওভারটাইম থাকলে আয় আরও বৃদ্ধি পায়।

সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থা ও আবেদন প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজের জন্য যাওয়া একটি সুসংগঠিত সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর মূল মাধ্যম হলো ঊসঢ়ষড়ুসবহঃ চবৎসরঃ ঝুংঃবস (ঊচঝ). ঊচঝ-এর আওতায় ‘৩উ’ কাজের জন্য বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ফিশারি খাতও অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশ থেকে আবেদন করতে হলে বোয়েসেল এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। সরকারি মাধ্যমে আবেদন করলে খরচ কম থাকে এবং প্রতারণার ঝুঁকি অত্যন্ত কম। ইঙঊঝখ নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে যেখানে প্রার্থীরা আবেদন করতে পারেন। এটি বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় কাজের জন্য যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ ও বৈধ চ্যানেল।

আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট

ফিশারি খাতে আবেদন করার জন্য প্রার্থীদের প্রস্তুত রাখতে হয় নি¤œলিখিত নথি; পূর্ণাঙ্গ আবেদনপত্র এবং বৈধ পাসপোর্ট ও কপি, সাম্প্রতিক তোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি, কোরীয় নিয়োগকারী কোম্পানির চাকরির প্রস্তাব এবং কর্মসংস্থান চুক্তিপত্র, শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র, পূর্ব অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট (যদি থাকে), ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসা নিবন্ধন লাইসেন্স এবং ট্যাক্স রিটার্নের মতো অতিরিক্ত নথি।

কোরীয় ভাষা ও পরীক্ষা

দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রম বাজারে প্রবেশের জন্য ভাষা জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ। ঊচঝ প্রোগ্রামের আওতায় অনেক সময় কোরীয় ভাষা পরীক্ষা (ঞঙচওক/ঊচঝ-ঞঙচওক) দেওয়া বাধ্যতামূলক। ভাষা জানা থাকলে কর্মক্ষেত্রে কাজ বোঝা, নিয়ম মেনে চলা এবং বেতন সুবিধা পাওয়া সহজ হয়। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ভাষা জানা বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে, তবে এটি একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।

কাজের সুযোগ ও ভিসা তথ্য

ঊচঝ প্রোগ্রামের আওতায় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিশারি খাতে কাজের সুযোগ

পান। ভিসা আবেদন করতে হয় এবং প্রতিটি ভিসার জন্য আলাদা প্রয়োজনীয়তা থাকে। সরকারি মাধ্যমে গেলে খরচ কম থাকে, প্রতারণার ঝুঁকি কমে এবং বৈধভাবে কাজের অনুমতি পাওয়া যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার ফিশারি খাতে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বেতন সাধারণত নি¤œরূপ:

মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে মাসিক ৫৫,০০০-১,২০,০০০ টাকা, মাছ ধরার ক্ষেত্রে মাসিক ৬০,০০০-১,৫০,০০০ টাকা, অন্যান্য ফিশারি কাজ: ৪৫,০০০-১,০০,০০০ টাকা

শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, ভাষা জ্ঞান এবং কাজের চ্যালেঞ্জ অনুযায়ী বেতন আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

কাজের প্রকৃতি ও সুবিধা

ফিশারি খাতে কাজ সাধারণত শারীরিক পরিশ্রমসাপেক্ষ। অনেক সময় সমুদ্র বা খামারে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কখনো কখনো ঠান্ডা বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে হয়।

সুবিধাসমূহ:

নিয়মিত বেতন এবং ওভারটাইম সুবিধা, খাবার ও আবাসন সরবরাহ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ, সরকারিভাবে গেলে খরচ কম এবং প্রতারণার ঝুঁকি কম।

চ্যালেঞ্জসমূহ:

শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠোর কাজ, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বাধা, দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকা।

যেভাবে আবেদন করবেন দক্ষিণ কোরিয়ার ফিশারি খাতে

বাংলাদেশিদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। আগ্রহীরা ইঙঊঝখ-এর মাধ্যমে সরকারিভাবে আবেদন করলে নিরাপদ ও বৈধভাবে কাজের সুযোগ পেতে পারেন।

দক্ষতা অর্জন, কোরিয়ান ভাষা শেখা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়। বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে প্রস্তুতি নিয়ে আবেদন করা সবচেয়ে ভালো।

দক্ষিণ কোরিয়ার ফিশারি শিল্পÑ বিশেষ করে মৎস্য চাষ এবং মাছ ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট, নিরাপদ এবং লাভজনক কাজের সুযোগ তৈরি করেছে।

এটি একটি কঠোর, শারীরিক ও মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জিং খাত হলেও বেতন, কর্মসংস্থান নিরাপত্তা এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ অনেক।