বহুমাত্রিক গুণের অনন্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার গত হয়েছেন ২৯ জুন। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। প্রায় শতায়ু, বলা যায়! এই মহতীর মৃত্যু সংবাদ সীমাহীন শূন্যতার সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির ভুবনে। আজ তিনি নেই। কত শত স্মৃতি আমাদের ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের.. সোনালি পাতায় পাতায় ভিজে উঠছে। আহা! কি নির্মল ছিল আমাদের শৈশব। বিনোদন মানেই ছিল শিল্পের বিশুদ্ধ ছোঁয়া। থিয়েটার, সিনেমা, লোকজ সংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান কিংবা বাড়িতে একটি মাত্র চ্যানেলের টিলিভিশন! সব মাধ্যমেই ছিল সুকুমার বৃত্তির চর্চা। র্দীঘ সময় ধরে মুস্তাফা মনোয়ার বটবৃক্ষের মতো আমাদের আগলে রেখেছেন। সাধারণের জীবনে দিয়ে গেছেন রং তুলির ছোঁয়া! তার সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল। তখন দৈনিক জনকণ্ঠে সহ-সম্পাদক পদে চাকুরি করি। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর শিল্পকলায় তার জন্মউৎসবের আয়োজন করা হয়। আমন্ত্রণ পেয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। নান্দনিক ছিল সেই আয়োজন। কথায়, শরীরিভাষায় এত বিনয়ী মানুষ জীবনে কম দেখেছি। হলরুমে বসে তাকে দেখতে দেখতে ছোটবেলার টেলিভিশনে দেখা ‘মনের কথা’র পারুল, মন্টু’র স্মৃতি ভীষণভাবে আবেগতারিত করে। ভাই-বন্ধু সবাই মিলে দেখতাম ‘মনের কথা’। হঠাৎ মনে হলো এ বরো সৌভাগ্য! তাঁরই সামনে বসে তাঁর কথা শুনছি! নিজের জন্মদিন উপলক্ষে অভিব্যক্তি জানাতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘ জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’ সত্যই মানুষ বড় হয়ে, নিজের ছোট বেলাকে অমুল্য রতœ তুল্য মনে করে। কয়েক প্রজন্মের কাছে মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পকর্ম রতœতুল্য। অমূল্যও বটে!
নুতন কুঁড়ি’র নির্মাতা, বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ কিংবা সবার প্রিয় ‘মীনা’ চরিত্রের সৃষ্টির এই মানুষটি ছিলেন শতভাগ শিল্পাশ্রিত পরিবারের মানুষ। বাবা বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা কবি গোলাম মোস্তাফা। বাংলাদেশ জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন তাঁর আপন বোনের ছেলে। বাংলাদেশী অস্কারজয়ী অ্যানিমেটর নাফিস বিন জাফর তার একই বোনের নাতি। নিজের দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে সাদাত মনোয়ার বাংলাদেশ বিমানের পাইলট। মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার চাকুরিজীবি। বোঝাই যায় কিভাবে গড়েছেন আগামী প্রজন্ম।
মুস্তাফা মনোয়ার শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলেন কলকাতা শহরে। শুরুতে তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র। পরবর্তীতে তার ছবি আঁকার হাত দেখে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী তাকে বলেছিল, বিজ্ঞান পড়ে প্রতিভা কেন নষ্ট করছো। ছবি আঁকো। আট কলেজে ভর্তি হয়। সেই থেকে তিনি শিল্পের সহযাত্রী। এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন শিল্প¯্রষ্টা। জীবনের শেষ সাক্ষাত করে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, শিল্পের ভাবনা কীভাবে আসে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘মনের ক্যামেরাটা সব সময় সচল রাখতে হবে। নিজের মনের ওপর বিশ^াস রাখতে হবে। এটা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি।’ হ্যাঁ, নিজের ওপর তাঁর অগাধ বিশ^াস ছিল। যার রূপন্তর ঘটেছে শিল্পে। শেষ দিনগুলোতে বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় কেউ দেখা করতে গেলে সবশক্তি দিয়ে কথা বলতেন। নতুন নতুন সৃষ্টির ভাবনা তাঁর ভেতর থেমে থাকেনি।
কলকাতায় পড়তে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেছেন। পাপেট নিয়ে পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরেছেন। বাংলাদেশের সহজিয়া চিন্তা পাপেট কিংবা পুতুলের চরিত্র সৃষ্টিকরে মানুষের মননে পৌঁচ্ছেছেন। বাংলাদেশ সৃষ্টির ভূমিকায়ও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। নিজের ভেতরের শিশুসুলভ মানুষটি সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। শিশুদের সঙ্গে থাকতে, তাদের নিয়ে ভাবতে পারা- মুস্তাফা মনোয়ার জীবনের প্রাপ্তি মনে করতেন। আর আমারা, তাঁর রং তুলিতে আকাঁ ছবির মতো ভবিষ্যত গড়ার স্বপ্ন দেখেছি..

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন