পর্দায় ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, আবার পর্দার পেছনে থেকে উপহার দিয়েছেন চমৎকার সব গল্প। বলছি জনপ্রিয় অভিনেতা ও নির্মাতা শামীম জামানের কথা। দীর্ঘদিনের অভিনয় জীবনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে এবার তিনি হাজির হচ্ছেন তিন প্রজন্মের এক তারকাবহুল পারিবারিক ধারাবাহিক নাটক ‘এক পাতিলের সংসার’ নিয়ে যেখানে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি সামলেছেন পরিচালনার দায়িত্বও। বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের রুচি, নাটকের বাজেট সংকট, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জোয়ার এবং বড় পর্দা নিয়ে নিজের আজন্ম স্বপ্নের কথা অকপটে জানিয়েছেন রূপালী বাংলাদেশকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রকিবুল ইসলাম আফ্রিদ
কাজের ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?
বর্তমানে ধারাবাহিক নাটক নিয়েই মূল ব্যস্ততা যাচ্ছে। আগামীকাল থেকে প্রচারে আসছে ‘এক পাতিলের সংসার’। ধারাবাহিকটি মুক্তি উপলক্ষে কাজের চাপ একটু বেশি। নাটকটিতে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাও করেছি, তাই সার্বিক প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এর মাঝেই একটি একক নাটকের কাজ শেষ করেছি এবং সামনে আরও কিছু প্রজেক্ট রয়েছে।
‘এক পাতিলের সংসার’-এ এত বড় তারকাবহর একসঙ্গে আনার ভাবনা কিভাবে এলো?
ধারাবাহিক নাটকটি মূলত একটি যৌথ পরিবারের গল্প। আর যৌথ পরিবারের গল্পে স্বভাবতই অনেক ধরনের চরিত্র থাকে, যেমন দাদা, চাচা, চাচি, ফুফু-ফুপাতো ভাই-বোনসহ সবাই মিলে এক বিশাল আয়োজন। তাই গল্পের গভীরতা ও চাহিদার কথা মাথায় রেখেই দক্ষ ও জনপ্রিয় শিল্পীদের যুক্ত করেছি। এখানে তারকাবহুল কাস্টিংয়ের ভাবনাটা মূলত গল্পের প্রয়োজনেই এসেছে। সত্যি বলতে, বাজেট কিছুটা কম থাকা সত্ত্বেও এমন একটি তারকাবহুল ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করার তীব্র ইচ্ছা থেকেই কাজটি করেছি।
অনেকেই বলছেন, এটি সেই সোনালি দিনের তারকাবহুল ধারাবাহিক নাটকের আবহ ফিরিয়ে আনবে। আপনি কি এ কথার সঙ্গে একমত?
হতে পারে, পারিবারিক গল্পের নাটক আমরা এর আগেও অনেক করেছি, তবে এবারের গল্পটি একটু ব্যতিক্রম। সাধারণত বাজেট স্বল্পতার কারণে এ ধরনের নাটকে আমরা অনেক বেশি চরিত্র একসঙ্গে নিয়ে আসতে পারি না। বিশেষ করে, একটি পরিবারের গল্পে একসঙ্গে দুই-তিনটি প্রজন্মকে (জেনারেশন) তুলে ধরার চেষ্টা এর আগে ওভাবে করা হয়নি। এবার আমি সেই সাহসটাই করেছিÑ এটি মূলত তিনটি প্রজন্মের একটি গল্প। যেহেতু গল্পে তিনটি জেনারেশনের মেলবন্ধন রয়েছে এবং এর কাহিনির বুননও বেশ চমৎকার, তাই আশা করছি, ধারাবাহিকটি দর্শকদের চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে। দর্শকদের ভালো কিছু উপহার দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করছি।
একসময় ‘হাড়কিপ্টে’, ‘হাউসফুল’, ‘৪২০’সহ এ সময়ের ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’-এর মতো তারকাবহুল ধারাবাহিক নাটক দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। ‘এক পাতিলের সংসার’ কি সেই হারিয়ে যাওয়া ধারাবাহিক নাটকের সোনালি যুগকে ফিরিয়ে আনতে পারবে বলে বিশ্বাস করেন?
আশা করি, হয়তো সেই সোনালি যুগ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে সময়ের ব্যবধানে দর্শকদের রুচি ও পছন্দে পরিবর্তন আসে। বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের মানসিকতা ও চাহিদা মাথায় রেখেই ‘এক পাতিলের সংসার’ নাটকের গল্পটি সাজানো হয়েছে। পুরোনো দিনের কাজ তো আসলে পুরোনোই থাকে, সেই সময়ে যেসব জনপ্রিয় নাটক ছিল, সেগুলো দিয়ে আমরা তৎকালীন দর্শকদের চাহিদা পূরণ করেছি। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে এই প্রজন্মের দর্শকদের মনের মতো করে গল্প বলা এবং তাদের চাহিদা পূরণ করাটাই আমি সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করি।
অভিনয় আর পরিচালনা, কোন পরিচয়ে নিজেকে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
আমি বরাবরই অভিনেতা হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তবে এর পাশাপাশি পরিচালনা করাটাও কিন্তু অনেক বড় একটা দায়িত্ব, এটি ভীষণ সৃজনশীল (ক্রিয়েটিভ) একটি কাজ, তাই পরিচালনা করতেও আমার ভালো লাগে। কিন্তু আমার প্রথম ও প্রধান পরিচয় আমি একজন অভিনেতা। যেহেতু আমার ক্যারিয়ারের শুরুটা অভিনয় দিয়েই হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় অভিনয়ের পর একটা সময়ে এসে পরিচালনায় হাত দিয়েছি, তাই এখন আমি দুটি পরিচয়ই বহন করছি। তবে দিনশেষে ‘অভিনেতা’ হিসেবে নিজের প্রথম পরিচয়টি দিতেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।
আপনি বলেছেন, ভালো গল্প থাকলে দর্শক সবসময় নাটক দেখবে। এখনকার নাটকে সেই গল্পের অভাব কোথায়?
গল্পের অভাব তো অবশ্যই আছে, তবে এর মধ্যেও অনেকে কিন্তু গল্প নিয়ে দারুণ কাজ করছেন। এই প্রজন্মের অনেকেই বেশ ভালো ভালো গল্প পর্দায় নিয়ে আসছেন, বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এখন চমৎকার সব গল্প নিয়ে কাজ হচ্ছে। বর্তমানে নানা ঘরানার গল্প দেখা যায়Ñ বলা যায়, ১০০টি নাটকের মধ্যে অন্তত ৫০টি নাটকের গল্পই ভালো হচ্ছে। আর একটি নাটকের গল্প যদি সত্যিই ভালো হয়, তবে দর্শকরা সেটি অবশ্যই দেখবেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই ভালোর মধ্যেও কিছু সমস্যা বা সতর্কতা রয়েছে। দর্শকদের সস্তা চাহিদা পূরণ করার জন্য আমরা এমন কিছু করতে পারি না যেখানে অশ্লীল সংলাপ বা অশ্লীলতার আশ্রয় নিতে হয়, আমরা এমন গল্প একদমই চাই না। আমরা চাই এমন সব গল্পে নাটক নির্মাণ হোক, যা পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে উপভোগ করা যায়। দর্শকদের সামনে এই ধরনের সুস্থ ও ভালো গল্প তুলে ধরতে পারলেই নাটকে গল্পের যে অভাব, তা পুরোপুরি দূর হবে।
এখনকার নাটকে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হওয়া দরকার?
নাটকের গল্পেই আসলে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমান সময়ে নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও অনুষঙ্গ, সবকিছুই এখন অনেক আধুনিক। ফলে নাটক নির্মাণ করা এখন বেশ সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ভালো গল্প এবং উপযুক্ত বাজেট। বিশেষ করে আমরা টিভি চ্যানেলের জন্য যে ধরনের ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করি, সে ক্ষেত্রে বাজেটের কাঠামোয় অবশ্যই পরিবর্তন আসা উচিত। কারণ উপযুক্ত বাজেট না থাকলে এমন তারকাবহুল নাটক নির্মাণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই আমি মনে করি, এই মুহূর্তে নাটকের গল্প এবং বাজেটÑ এই দুটি বিষয়েরই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার।
এমন কোনো চরিত্র আছে, যা করার স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ?
নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রের কথা ওভাবে বলা যাবে না। নিজেকে একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবে প্রমাণ করার জন্য দর্শকদের সামনে এখনো আরও অনেক ভিন্নধর্মী ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে হাজির হওয়ার ইচ্ছা আছে। সত্যি বলতে, এখনই তো আমার ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করার সঠিক বয়স। আমি নিজেকে ভাঙতে এবং যেকোনো চরিত্রে মানিয়ে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। তাই নির্দিষ্ট কোনো একটি চরিত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে, সব ধরনের চরিত্রেই কাজ করতে চাইÑ বিশেষ করে চ্যালেঞ্জিং চরিত্রগুলো আমাকে বেশি টানে। এর আগে আমি বহুবার চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে ভেঙেছি, আর ভবিষ্যতেও নতুন নতুন চরিত্রের অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে আরও ভাঙতে চাই।
পরিবার আপনার অভিনয় জীবনে কতটা ভূমিকা রেখেছে?
আমার জীবনে পরিবারের ভূমিকা অনেক বেশি। পরিবার যদি পাশে না থাকত, তবে আমার পক্ষে অভিনেতা হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আমার বাবা-মা, ভাই-বোনÑ শুরু থেকেই সবার অবদান ছিল অনন্য। আমি যখন থিয়েটার (মঞ্চনাটক) করতাম, তখন তো আর এখনকার মতো এত মানুষের দেখার বা জানার সুযোগ ছিল না। এরপর যখন টেলিভিশনে কাজ করা শুরু করলাম, পর্দায় আমার ছোট ছোট চরিত্র দেখেই বাবা ভীষণ খুশি হতেন। পাশাপাশি আমার পরিবারের সবাই আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। এমনকি বিয়ের পর আমার স্ত্রী এবং সন্তানেরাও আমাকে সবসময় যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়ে আসছে। এক কথায়, সবার এই ভালোবাসার কারণেই আমি আজ এখানে আসতে পেরেছি।
মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরীর পর সম্প্রতি আ খ ম হাসানকে ওটিটিতে দেখা গেছে। আপনাকে কবে দেখবে দর্শক?
এ প্রশ্নের উত্তর তো আসলে আমি দিতে পারব না। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নির্মাতারা যদি আমাকে একজন অভিনেতা হিসেবে ভাবেন এবং কাজের জন্য ডাকেন, তবে আমি অবশ্যই ওটিটিতে কাজ করতে চাই। যেকোনো সময় এমন প্রস্তাব এলে আমি কাজ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ওটিটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে একটি চরিত্রের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় এবং চরিত্রটি নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকে। তাই আমার ভীষণ ইচ্ছা আছে ওটিটিতে কাজ করার, এখন বাকিটা পরিচালকদের ওপর নির্ভর করছে।
ওটিটির জন্য নির্মাণের পরিকল্পনা আছে?
অবশ্যই আছে। এমন ইচ্ছা আসলে সব নির্মাতারই থাকে। ওটিটির কাজের জন্য যে ধরনের বিশেষ প্রস্তুতি কিংবা যেমন গভীর গল্পের প্রয়োজন, তার সবই আমার ভেতরে আছে, কিন্তু এখনো সেটাকে বাস্তব রূপ দিতে পারছি না। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো যদি আমাকে সেই সুযোগ এবং স্বাধীনতা দেয়, তবে আমি অবশ্যই আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণে নামতে পারব।
সিনেমা নিয়ে কি ভাবছেন?
সিনেমা অবশ্যই করব। একজন পরিচালক কিংবা একজন অভিনেতা, সবারই বড় পর্দায় কাজ করার একটা আজন্ম স্বপ্ন বা ইচ্ছা থাকে। কারণ আমরা তো মূলত অভিনেতা, তাই অভিনয়ের আসল তৃপ্তিটা ওখানেই। সিনেমায় অভিনয় করার তীব্র ইচ্ছা যেমন আমার আছে, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতে নিজের পরিচালনায় একটি সিনেমা বানানোর স্বপ্নও আমি বুনে চলেছি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন