সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরে গভীর রাতে ব্যাটারিচালিত শক মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে মাছ নিধনের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুতের শকে অসংখ্য মাছ মারা গিয়ে পরদিন হাওরের পানিতে ভেসে উঠছে, যা হাওরের পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি। প্রতিবছর এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও অসংখ্য পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে নির্বিচারে শক মেশিন ব্যবহার করে মাছ নিধন চলতে থাকলে হাওরের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়বে এবং ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
জানা গেছে, আল্ট্রাসনিক ইলেকট্রিক ফিশিং ইনভার্টার মেশিন ইতোমধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বিভিন্ন গ্রামের জেলেদের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে জানান, এসব মেশিন মূলত পার্শ্ববর্তী নেত্রকোনা জেলার এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই আল্ট্রাসনিক ইলেকট্রিক ফিশিং ইনভার্টার মেশিন ব্যবহার করে হাওরের গভীর জলাশয়ে একটানা ১ থেকে দেড় মিনিট পর্যন্ত পানির ভেতরে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ ফুট এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই পানিতে থাকা ছোট-বড় মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী অজ্ঞান হয়ে পানির ওপর ভেসে ওঠে। এরপর সেসব মাছ খুব সহজেই শিকার করা হয়। পরিবেশবিদদের মতে, এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারে শুধু মাছ নয়, হাওরের পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পোনা ও ডিম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাছ উৎপাদন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয়রা বলেন, জেলেরা রাতের অন্ধকারে নৌকায় ব্যাটারিচালিত শক মেশিন সেট করে পানিতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে। এতে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ও জলজ প্রাণী তাৎক্ষণিকভাবে অবশ হয়ে মারা যায় বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, যা পরে জেলেরা সহজেই সংগ্রহ করে। এতে বিদ্যুতের শকে মাছের ডিম এবং পোনা মাছ ব্যাপকভাবে ধ্বংস হচ্ছে, যার ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছের আকাল দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে এবং মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত অন্যান্য জলজ কীটপতঙ্গও মারা যাচ্ছে।
হাওরপাড়ের বাসিন্দা নজির হোসেন জানান, একটি সংঘবদ্ধ চক্র রাতের আঁধারে হাওরের বিভিন্ন অংশে শক মেশিন ব্যবহার করে মাছ শিকার করছে। এতে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ছোট মাছ ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে। এর ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং হাওরের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।’
এদিকে হাওর এলাকার সচেতন মহল অবৈধ মাছ নিধন বন্ধে নিয়মিত টহল জোরদার, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং শক মেশিন জব্দের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে শক মেশিন ব্যবহার করে মাছ ধরা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এটি দ-নীয় অপরাধ। হাওরের পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

