ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ধানের মাঠে বিষাদের ছায়া

গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ০১:১৮ এএম

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রাজিবপুর গ্রামে ইটভাটার আগুনের উত্তপ্ত ধোঁয়ায় কৃষকের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আরবিসি নামের একটি ইটভাটার নির্গত ধোঁয়ার প্রভাবে প্রায় দেড়শ বিঘা জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এতে শতাধিক কৃষক চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, গ্রামটির চারপাশজুড়ে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি থাকলেও মাঝখানে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। এই ভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও উচ্চ তাপমাত্রার গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ফসলের ওপর প্রভাব ফেলছে। ধোঁয়ার কারণে ধানের শীষ সাদা হয়ে চিটায় পরিণত হচ্ছে, দানা ঠিকমতো পূর্ণ হচ্ছে না এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ফরিতোন বেগম চার বিঘা জমিতে দাদনের টাকা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। ভালো ফলনের আশায় ছিলেন তিনি। কিন্তু ভাটার ধোঁয়ায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সংসার চালানো এবং ঋণের টাকা শোধ করা নিয়ে তিনি দিশাহারা।

একই গ্রামের কৃষক সাজু মিয়া, আলমগীর হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, ভোলা মিয়া, মঞ্জু মিয়া, রাজু ম-ল, ওমর আলী, জহির উদ্দিন ও আসাদুল ইসলামসহ আরও অনেকে জানান, ধারদেনা করে চাষ করা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চরম বিপদে পড়েছেন। তারা ইটভাটা সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতি পূরণের দাবি জানিয়েছেন।

শুধু ফসল নয়, ইটভাটার ধোঁয়া পরিবেশেও ব্যাপক ক্ষতি করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশবিদদের মতে, ইটভাটার অনিয়ন্ত্রিত কালো ধোঁয়া ও কার্বন নির্গমন বাতাস দূষিত করে।

এতে স্থানীয়ভাবে যে ক্ষতিগুলো দেখা দেয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বাতাসে বিষাক্ত কণার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। মাটির উর্বরতা ধীরে ধীরে কমে যায়, ফলে কৃষি উৎপাদন কমে। ফসলের পাতায় ধুলো ও রাসায়নিক কণা জমে সালোকসংশ্লেষণ বাধাগ্রস্ত হয়। পানির উৎস দূষিত হয়ে মানব ও পশুস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে। পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ে।

ভাটার মালিক আলতাফ হোসেন ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি জানান, ভাটা মালিককে কাগজপত্রসহ ডাকা হয়েছে। তদন্ত করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. মাসুদার রহমান মোল্লা বলেন, কৃষিজমির ফসল ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষিজমির কাছাকাছি ইটভাটা স্থাপন এবং পরিবেশগত আইন না মানার কারণে প্রতিবছর একই ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।