দুপুর গড়িয়ে বিকেল। একসময় যে প্রাঙ্গণে নতুন সিনেমার পোস্টার দেখতে আর টিকিট কিনতে দর্শকদের ভিড় লেগে থাকত, সেই জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আয়না সিনেমা হল এখন অনেকটাই নীরব। টিকিট কাউন্টারের সামনে নেই কোনো লাইন, নেই দর্শকদের কোলাহল। ধুলোমাখা দেয়াল আর ফাঁকা আসন যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে একসময়ের জমজমাট বিনোদনকেন্দ্রের করুণ বাস্তবতার।
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আয়না সিনেমা হল একসময় শুধু আক্কেলপুর নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার মানুষের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র ছিল। নব্বইয়ের দশক এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা মুক্তি পেলেই দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত। বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে নতুন ছবি মুক্তি পেলে টিকিট সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো দর্শকদের।
স্থানীয় বাসিন্দা সুখদেব চন্দ্র (৫৮) বলেন, ‘তখন সিনেমা হল ছিল মানুষের মিলনমেলা। পরিবারের সবাই মিলে সিনেমা দেখতে আসতাম। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সিনেমা দেখাÑ সব মিলিয়ে উৎসবের মতো পরিবেশ ছিল। এখন সেই দিনগুলো শুধুই স্মৃতি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দুই দশকে মোবাইল ফোন, ইউটিউব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও স্মার্ট টেলিভিশনের বিস্তারে মানুষের বিনোদনের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন ঘরে বসেই দর্শকরা দেশি-বিদেশি সিনেমা, নাটক ও ওয়েব সিরিজ দেখতে পারছেন। ফলে প্রেক্ষাগৃহমুখী দর্শকের সংখ্যা দিন দিন কমছে।
আক্কেলপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলেন, ‘মাসে কয়েকশ টাকা খরচ করলেই মোবাইলে হাজারো সিনেমা ও সিরিজ দেখা যায়। তাই আলাদা করে সিনেমা হলে যাওয়ার প্রয়োজন খুব একটা অনুভব করি না।’
আয়না সিনেমা হলের মালিক মরহুম আবুল কালাম আকন্দের ছেলে রাসেল আজাদ আকন্দ জানান, একসময় প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার দর্শক সিনেমা দেখতে আসতেন। বর্তমানে দিনে তিন থেকে পাঁচজন দর্শকও পাওয়া যায় না। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৫০ জন দর্শক হলেও হলটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো। আগে সপ্তাহে সাত দিন চারটি করে শো চললেও এখন দর্শক সংকটের কারণে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে সিনেমা হলটি। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল, নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়েছে। হল বন্ধ থাকলেও এসব খরচ বহন করতে হয়। দিনের পর দিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। ভালো মানের সিনেমা নির্মিত হলে হয়তো দর্শক আবার হলে ফিরবে। সরকার যদি হল মালিকদের জন্য যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আমরা আবারও হল চালু রাখতে পারব।’
স্থানীয় প্রবীণ আব্দুস সালাম (৬৫) স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘শাবানা, আলমগীর, সালমান শাহ কিংবা মান্নার সিনেমা এলে টিকিটের জন্য মানুষের কী ভিড় হতো! অনেক সময় কালোবাজারিও দেখা যেত। এখন হলের সামনে দাঁড়ালে মন খারাপ হয়ে যায়।’
জেলা সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জয়পুরহাট জেলায় একসময় ১৭টি সিনেমা হল ছিল। এর মধ্যে রবি টকিজ (১৯৬৯), রূপালী (১৯৭৯), চিত্রা (১৯৮২), নাজনীন, আনন্দ, নাজমা, পৃথিবী ও আয়নাসহ বেশ কয়েকটি হল দর্শকদের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শক কমে যাওয়ায় অধিকাংশ হলই বন্ধ হয়ে গেছে। কোনোটি গুদামঘর, কোনোটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে জেলাশহরের পৃথিবী সিনেমা হল।
আক্কেলপুর থিয়েটারের সভাপতি আয়ুব মিয়া বলেন, ‘প্রেক্ষাগৃহ শুধু সিনেমা দেখার জায়গা নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও। আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, উন্নত আসনব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দর্শকদের একটি অংশকে আবারও হলমুখী করা সম্ভব। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পুরোনো প্রেক্ষাগৃহগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং নিয়মিত প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকলে দর্শক আবারও সিনেমা হলে ফিরতে পারেন।’ প্রবীণ দর্শক আব্দুল কাদের বলেন, ‘একসময় সপ্তাহের একটি দিন পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতাম। এখন সবাই নিজের মোবাইলের পর্দায় ব্যস্ত। শুধু একটি সিনেমা হল নয়, হারিয়ে যাচ্ছে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশও।’ প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের বিনোদনের মাধ্যম। তবে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আক্কেলপুরের ঐতিহ্যবাহী আয়না সিনেমা হলও একদিন শুধুই স্মৃতির পাতায় স্থান করে নেবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন