ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

শীতলক্ষ্যার বুকে টিকে থাকার লড়াই

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০৬:১৬ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স খেয়াঘাটে প্রতিদিনই দেখা মেলে ৭৫ বছর বয়সি মাঝি হোসেন আলীর। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও জীবিকার তাগিদে এখনো বৈঠা হাতে শীতলক্ষ্যার বুকে নামেন তিনি। প্রায় চার দশক ধরে নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মানুষটির জীবন এখন সংগ্রাম, স্মৃতি আর ভালোবাসার এক অনন্য গল্প।

একসময় শীতলক্ষ্যা নদীর স্বচ্ছ পানিতে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাতেন হোসেন আলী। খেয়াঘাটের আয় দিয়েই সন্তানদের বড় করেছেন। বিশেষ করে গভীর রাতে অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে তার নৌকাই ছিল অনেক মানুষের একমাত্র ভরসা। অনেক সময় মানবিক কারণে বিনা ভাড়ায়ও মানুষ পারাপার করেছেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে নদীর চিত্র। শিল্পকারখানার বর্জ্যে দূষিত হয়েছে শীতলক্ষ্যার পানি। বেড়েছে বড় বড় জাহাজ ও পণ্যবাহী নৌযানের চলাচল। ফলে ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে নদীতে চলাচল এখন আগের চেয়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সফিউল্লাহ বলেন, ‘হোসেন মাঝি শুধু একজন নৌকার মাঝি নন, তিনি এলাকার মানুষের আস্থার প্রতীক। রাত-বিরাতে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিতে তিনি কখনো না করেননি। অনেক সময় বিনা পারিশ্রমিকেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

নদীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করে হোসেন আলী বলেন, ‘আগে নদীর পানি ছিল পরিষ্কার। এখন পানিতে হাত দিলেই চুলকানি হয়। বড় বড় জাহাজ চলাচলের কারণে ভয় নিয়েই নৌকা চালাতে হয়। অনেক মাঝি এই পেশা ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু আমি আর কোথায় যাব? এই নৌকাই আমার জীবন।’

স্থানীয় প্রবীণ মৎস্যজীবী নুরুল ইসলাম জানান, একসময় শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ। বর্তমানে দূষণ ও ভারী নৌযানের কারণে নদীর পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকায়। বয়সের ভার সত্ত্বেও নিজের ডিঙি নৌকার যতœ নিতে ভুল করেন না হোসেন আলী। মাঝেমধ্যে নৌকায় আলকাতরা লাগিয়ে মেরামত করেন। তার কাছে এই নৌকা শুধু আয়ের মাধ্যম নয়, বরং জীবনের দীর্ঘ পথচলার সঙ্গী।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘শীতলক্ষ্যা নদী আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। নদী দূষণ রোধ এবং নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’

নদীর পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেও হোসেন মাঝির মতো মানুষরা এখনো শীতলক্ষ্যার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। তার জীবনসংগ্রাম শুধু একজন মাঝির গল্প নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা নদীকেন্দ্রিক জনপদ ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।