বর্ষার ভরা মৌসুমে মেঘনা নদীতে সাধারণত ইলিশের প্রাচুর্য থাকে। নদীতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ ধরা পড়ার কথা। মাছে মাছে ভরে ওঠার কথা ঘাট, আর জেলেদের মুখে ফোটার কথা স্বস্তির হাসি। কিন্তু চলতি মৌসুমে ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরার মেঘনা নদীতে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। ভরা মৌসুমেও নদীতে মিলছে না কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা। ফলে চরম দুশ্চিন্তা, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উপজেলার হাজারো জেলে পরিবারের।
সম্প্রতি উপজেলার রামনেওয়াজ মাছ ঘাট, হাজিরহাট মৎস্যঘাট, দক্ষিণ সাকুচিয়া জনতা বাজার মৎস্যঘাট, মাঝেরঘাট এবং উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের খারির খালসহ চরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলেপল্লি ঘুরে জেলেদের মধ্যে দেখা গেছে তীব্র হতাশার চিত্র। অনেকেই চড়া সুদে ধার-দেনা ও দাদন নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গেলেও আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মেঘনার বুকে জাল ফেলছেন জেলেরা। কিন্তু দিনশেষে কেউ ফিরছেন নামমাত্র কিছু মাছ নিয়ে, আবার কেউ ফিরছেন প্রায় খালি হাতে। মাছ বিক্রি করে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে ট্রলারের জ্বালানি তেল, বরফ ও শ্রমিকের খরচও উঠছে না। ফলে দিন দিন আর্থিক সংকট যেমন বাড়ছে, তেমনি কিস্তির জন্য এনজিও ও মহাজনদের ঋণের চাপও দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
মাঝেরঘাট এলাকার জেলে আব্দুল করিম বলেন, ‘প্রতিদিন বুক ভরা আশা নিয়ে নদীতে যাই, কিন্তু মাছ খুব কম পাচ্ছি। আগে এক টানে যত ইলিশ উঠত, এখন কয়েকবার জাল ফেলেও তার অর্ধেক মাছও মিলছে না। এভাবে চললে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
একই সুর শোনা গেল জনতা বাজার মৎস্য ঘাটের জেলে মো. সেলিমের কণ্ঠেও। তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘তেল, বরফ ও নৌকার খামালদের (শ্রমিক) খাবারের খরচ এখন আকাশছোঁয়া। নদীতে গিয়ে যদি তেল খরচই না ওঠে, তবে পরিবার নিয়ে বাঁচব কীভাবে? আমরা এখন দিশাহারা।’
ইলিশের এই আকালের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মাছঘাট ও আড়তগুলোতেও। ভরা মৌসুমের এই সময়ে ঘাটগুলোতে যেখানে ২৪ ঘণ্টা কর্মচাঞ্চল্য থাকার কথা, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। সরবরাহ কম থাকায় আড়তদার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে।
রামনেওয়াজ ঘাটের মৎস্য ব্যবসায়ী মমিন তালুকদার জানান, ‘ভরা মৌসুমে সাধারণত ঘাটে পা ফেলার জায়গা থাকে না, ইলিশে ইলিশে ভরে যায় চারপাশ। এবার সেই তুলনায় চারভাগের একভাগ মাছও আসছে না। বেচাকেনা না থাকায় আমাদের ব্যবসাতেও মন্দা চলছে, প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
তবে পরিস্থিতি নিয়ে এখনো আশাবাদী স্থানীয় মৎস্য বিভাগ। মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা উজ্জ্বল বণিক বলেন, ‘ইলিশের চলাচল মূলত নদীর গভীরতা, পানির নাব্য, জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় ইলিশের পরিযায়নের (চলাচলের) সময় কিছুটা পিছিয়ে যায়। তবে মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। আশা করছি, আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টিপাত বাড়লে এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে নদীতে ইলিশের ঝাঁক আসবে এবং পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন