ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

ক্ষোভ নিয়ে হাওরে জেলেরা

নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:৩৪ এএম

দীর্ঘ এক মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য ভান্ডার নেত্রকোনাসহ হাওরাঞ্চলে আবার মাছ ধরা শুরু হয়েছে। গত রোববার শেষ হয়েছে সরকারের জারি করা মাসব্যাপী মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই জেলেরা জাল ও নৌকা নিয়ে হাওরে নেমে পড়েছেন। তবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও হাওরপাড়ের প্রান্তিক জেলেদের মনে আনন্দের চেয়ে ক্ষোভ ও হতাশার ছাপই বেশি দেখা যাচ্ছে।

জেলেদের অভিযোগ, দিনের বেলা প্রশাসনের কিছুটা কড়াকড়ি ও অভিযান থাকলেও রাতের আঁধারে প্রভাবশালীরা অবাধে মাছ লুট করেছে। ফলে সরকারের এই উদ্যোগ মা মাছ ও পোনা রক্ষায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি, উল্টো সাধারণ ও প্রান্তিক জেলেরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তদারকি না থাকায় গত এক মাস ধরে প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে হাওরের বিভিন্ন অংশ থেকে অবাধে মাছ আহরণ করেছে। দিনের পর দিন চলা এই অনিয়মের কারণে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় জেলেরা। পেটের দায়ে কোনো কোনো সাধারণ জেলে গোপনে মাছ ধরতে বাধ্য হলেও বড় ধরনের আর্থিক ফায়দা লুটেছে প্রভাবশালীরাই।

এ বছর পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় হাওরাঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোর শেষ ভরসা ছিল হাওরের দেশীয় মাছ। কিন্তু  ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিস অ্যাক্ট, ১৯৫০’ অনুযায়ী গত ২৯ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত প্রথমবারের মতো হাওরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করায় চরম বিপাকে পড়েন তারা।

নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়টাতে সরকারি নির্দেশনা মেনে জেলেরা কর্মবিরতিতে থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোর ভাগ্যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি খাদ্য কিংবা আর্থিক সহায়তা জোটেনি। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, শুধু নেত্রকোনা জেলাতেই নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৩৯৩টি। কোনো বিকল্প কর্মসংস্থান বা প্রণোদনা না থাকায় এই এক মাসে হাজার হাজার পরিবারকে ধার-দেনা করে চলতে হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ জানান, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সিলেটসহ মোট ৭টি হাওর অধ্যুষিত জেলায় মাছের প্রজনন নিশ্চিত করতে এবং ছোট মাছগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে এই ৩১ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। প্রথমবারের মতো সরকারি গেজেটের মাধ্যমে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নিষেধাজ্ঞাকালীন অভিযানের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ২৫ জুন পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৭০০টি চায়না দুয়ারি জাল এবং ২৩৭টি কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একটি জালের গুদাম জব্দ করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে ১৫ দিনের জেল এবং ১ মাসে মোট ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

জেলেদের প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমবার হওয়ায় এবার জেলেদের কোনো প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে জেলেদের তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে এবং আগামী বছর থেকে তাদের ভিজিএফ বা ভিজিডির আওতায় নিয়ে এসে এককালীন খাদ্য বা অর্থ সহায়তা প্রদানের জোরালো প্রস্তাবনা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আগামীতে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বার্সিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ওয়াহেদুর রহমান বলেন, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও খাদ্য সহায়তা ছাড়া শুধু কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মাছের প্রজনন রক্ষা করা অসম্ভব।

হাওরবাসীর এখন একটাই বড় প্রশ্ন, দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধি রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই আইন মানতে গিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়া হাজারো প্রান্তিক জেলের মুখে অন্ন জেগানোর দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের নয়? সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী বছর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে যদি নিশ্চিত প্রণোদনা এবং রাতের বেলার অবৈধ মৎস্য শিকার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই ভালো উদ্যোগটি মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি ব্যর্থতায় রূপ নিতে পারে।