ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

নারী শিক্ষকহীন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

মুজিবুর রহমান রঞ্জু, পূর্বাঞ্চল
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:৩৬ এএম

মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো নারী শিক্ষক নেই। প্রায় ৬০০ ছাত্রীর এই বিদ্যাপীঠে দীর্ঘদিন ধরে নারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সর্বশেষ কর্মরত একমাত্র নারী শিক্ষক তিন বছর আগে মারা যাওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়টি পুরোপুরি নারী শিক্ষকহীন হয়ে পড়ে। এতে ছাত্রীদের বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্যগত সমস্যা, ব্যক্তিগত ও মানসিক সংকট নিয়ে চরম সংকোচ ও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৩০ সালে শ্রীমঙ্গলের বনেদি পরিবারের সদস্য রাধানাথ দেব চৌধুরী তার মায়ের নামে ‘দয়াময়ী বালিকা বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হলে এর নামকরণ হয় ‘শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। বর্তমানে এখানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জন ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যা ১৯টি হলেও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৬টি পদ শূন্য রয়েছে। সম্প্রতি একজন ধর্ম শিক্ষককে প্রেষণে (ডেপুটেশনে) অন্য বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারদীয়া মল্লিক ও বৈশাখী পাল জানায়, পুরুষ শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করলেও কিছু বিষয়ে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা যায় না। বিশেষ করে পিরিয়ড বা মাসিকসংক্রান্ত হঠাৎ কোনো জটিলতা তৈরি হলে তারা তীব্র লজ্জায় পড়ে যায়। নারী শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে ‘গার্লস গাইড’ কার্যক্রম ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমও প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। জেলা বা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ছাত্রীরা পুরুষ শিক্ষকদের সঙ্গে দূরের পথ ভ্রমণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। ফলে ছাত্রীদের নেতৃত্ব ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিভাবক দিলিপ কৈরী ও আব্দুর রহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে একজনও নারী শিক্ষক না থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মেয়েদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত এখানে নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী এই বিষয়ে বলেন, ‘বয়ঃসন্ধিকাল মেয়েদের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ছাত্রীদের পাশে একজন নারী শিক্ষক থাকা আবশ্যক, যাতে তারা সহজে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে পারে।’

বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পাঠদানে সমস্যা না হলেও ছাত্রীদের মানসিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের স্বার্থে নারী শিক্ষকের উপস্থিতি এখানে অপরিহার্য।

এদিকে প্রশাসনিকভাবে বারবার আবেদন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে এই বিদ্যালয়ে কোনো নারী শিক্ষক পদায়ন করা হচ্ছে না। সর্বশেষ গত ১৬ থেকে ২৩ জুনের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে ৩৮ জন শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে রদবদল করা হলেও এই তালিকায় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম ওঠেনি।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী জানান, সমস্যাটির সমাধানে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী সংশ্লিষ্ট বিভাগে ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দিয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সিলেট বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় এখানে নারী শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে মাউশিতে পাঠানো হয়েছিল। চলতি বছরের ১০ মার্চ এবং সর্বশেষ ২০ মে মাউশি সিলেটের আঞ্চলিক পরিচালকও ঢাকাস্থ মহাপরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন পাঠান। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

এ বিষয়ে মাউশির সহকারী পরিচালক এস এম জিয়াউল হায়দার হেনরী জানান, আদেশ বাস্তবায়ন করা তাদের কাজ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

অন্যদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক শাখা) মো. ইউনুছ ফারুকী বলেন, ‘নতুন নিয়োগ বা পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি হলে শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। বর্তমানে এই পদে আবেদনকারী পাওয়া যাচ্ছে না, আবার অনেক সময় পদায়ন করা হলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা সেখানে থাকতে চান না।’ এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৯৮ শতাংশ পাসের গৌরব ধরে রাখা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ও কয়েকজন নারী শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।