ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

দেড় ফুটের দোকানেই তিন দশকের সংসার

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর পৌর শহরের হাসপাতালের পশ্চিম প্রান্তসংলগ্ন ব্যস্ত মেইন সড়ক। প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচল ও যানবাহনের কোলাহলে মুখর এই এলাকাতেই প্রায় অদৃশ্য এক দোকান-মাত্র দেড় ফুট প্রস্থ ও পাঁচ ফুট দৈর্ঘ্যরে একটি ছোট্ট কাঠামো। বাইরে থেকে দোকানটি চোখে না পড়লেও এই ক্ষুদ্র জায়গাতেই গত তিন দশক ধরে তালা-চাবি মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন মো. আব্দুল মতিন (৫৬), যিনি পৌর এলাকার একমাত্র তালা-চাবি কারিগর।

সরেজমিনে দেখা যায়, দোকানের সামনে মাত্র আড়াই ফুট দূরেই মেইন সড়ক, এক পাশে বিদ্যুতের খুঁটি এবং অন্য পাশে বড় সাইনবোর্ডের খুঁটি থাকায় দোকানটি সহজে চোখে পড়ে না। ফলে অনেক ক্রেতাই দোকান খুঁজে না পেয়ে ফিরে যান।

মো. আব্দুল মতিনের বাড়ি জয়পুরহাটের জামালপুর ইউনিয়নের খেজুরতলী গ্রামে। পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তিনি পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। অন্যের দোকানে কাজ শিখে ১৯৯৬ সালে আক্কেলপুর হসপিটাল এলাকার পশ্চিম পাশে এই ছোট্ট দোকান স্থাপন করে শুরু করেন নিজের পেশাজীবন।

তিনি বলেন, ‘শুরুতে বাজারে পাঁচ-ছয়জন তালা-চাবির কারিগর ছিল। এখন সবাই অন্য পেশায় চলে গেছে। এই পৌরসভায় এখন আমি একাই এই কাজ করি। এই ছোট্ট দোকান থেকেই স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চালিয়েছি গত ৩০ বছর ধরে।’

দোকানের ভেতরে একজন মানুষ বসলে নড়াচড়ার জায়গাও থাকে না। চারদিকে গাদাগাদি করে রাখা তালা, চাবি, কাটিং মেশিন, ফাইল, প্লায়ার্স ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি। তিনি বলেন, অনেক ক্রেতা ফোন করে দোকান খুঁজে না পেয়ে ফিরে যান, কেউ কেউ কয়েকবার খুঁজে তারপর আসেন।

এক সময় দৈনিক আয় ছিল দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায়, কোনো কোনো দিন ২০০ টাকায়ও দিন পার করতে হয়। বিদ্যুৎ বিল, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ব্যয় মিলিয়ে মাসে আরও কয়েক হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘আগে মানুষ তালা মেরামত করাত, এখন নষ্ট হলে নতুন কিনে নেয়। ডিজিটাল লক আসায় কাজ আরও কমে গেছে। আমার পর এই পেশায় আর কেউ আসবে কিনা জানি না।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী তুফান বলেন, একসময় আক্কেলপুর বাজারে অন্তত পাঁচজন তালা-চাবির কারিগর ছিলেন, কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সবাই অন্য পেশায় চলে গেছেন। নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, জরুরি প্রয়োজনে মতিন ভাই ছাড়া এলাকায় আর কোনো তালা-চাবি কারিগর নেই। দোকানটি সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না বলেও তিনি জানান।

আক্কেলপুর কলেজ বাজার বণিক সমবায় সমিতির আহ্বায়ক মো. আলমগীর চৌধুরী বাদশা বলেন, ‘মতিন ভাই দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করছেন। তার দোকানের অবস্থান এমন যে অনেক ক্রেতা সহজে খুঁজে পান না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আক্কেলপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম আব্দুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি স্থানান্তরের বিষয়টি কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কেউ লিখিত আবেদন করলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জয়পুরহাট বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র কারিগরি পেশা টিকিয়ে রাখতে দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টরা সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারেন। দীর্ঘ ৩০ বছরের সংগ্রামী জীবনে এই ক্ষুদ্র দোকানই মো. আব্দুল মতিনের জীবিকা ও অস্তিত্বের ভিত্তি হয়ে আছেÑ যেখানে একটি পেশার পাশাপাশি টিকে আছে এক অনন্য জীবনকাহিনি।