গ্রিসে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার এক কৃষকের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও জমি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একই গ্রামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর দাবি, গ্রিসে নেওয়ার কথা বলে প্রথমে তাকে সৌদি আরব এবং পরে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক হয়ে একাধিক কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর পরিবারের অর্থ ব্যয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি। একই চক্রের মাধ্যমে গ্রামের আরও কয়েকজন বর্তমানে লিবিয়ার কারাগারে বন্দি রয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী মোখলেছুর রহমান ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের ধুরুয়া ভাষাবদ্ধ গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মোখলেছুর রহমান জানান, একই গ্রামের আব্দুল কাদের তাকে গ্রিসে তার ছেলে নাঈমের মাধ্যমে স্ট্রবেরি বাগানে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। সেখানে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতন পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়। ওই প্রলোভনে তিনি ২০ লাখ টাকার চুক্তিতে নগদ পাঁচ লাখ টাকা দেন এবং প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩৩ শতক জমি সাফকবালা করে দেন।
চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের ২ এপ্রিল তিনি বিমানযোগে প্রথমে সৌদি আরব যান। সেখানে ওমরাহ পালন করানোর পর তাকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই দেশটির সেনাবাহিনী তাকে আটক করে।
মোখলেছুর রহমানের ভাষ্য, প্রথমে তাকে আরও ১৩ জনের সঙ্গে একটি ছোট কক্ষে তিন দিন আটকে রাখা হয়। জায়গা এতটাই সংকীর্ণ ছিল যে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে পুরো সময়। ওই সময়ে পর্যাপ্ত খাবার কিংবা পানি দেওয়া হয়নি। এরপর তাকে বেদা কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে ২৭ দিন বন্দি অবস্থায় সকালে একটি ছোট পাউরুটি ও রাতে অল্প পরিমাণ পাস্তা দেওয়া হতো। নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, পরে তাকে গাম্ভোজা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে গিয়ে প্রায় এক হাজার বাংলাদেশিকে বন্দি অবস্থায় দেখতে পান। পুরো সময় তিনি কাদের ও তার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও মুক্তির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন।
অবশেষে পরিবারের সদস্যরা প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। দেশে ফিরে তিনি দেখতে পান, তার দেওয়া জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এর পর থেকে অভিযুক্ত কাদেরকে আর এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগীর ছেলে মো. উবায়দুর রহমান জানান, বাবার নির্যাতনের বর্ণনা শুনে তিনি বাদী হয়ে ময়মনসিংহ মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি বর্তমানে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা ওয়াহেদ আলী অভিযোগ করেন, তার ছেলে আসাদ উল্লাহ উজ্জ্বলকে গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে কাদের ১২ লাখ টাকা নেন। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে তিনি লিবিয়ার কারাগারে বন্দি। মুক্ত করার কথা বলে আরও এক লাখ টাকা নেওয়া হলেও পরে তা ফেরত দেওয়া হয়। তবে তার ছেলে এখনো দেশে ফিরতে পারেননি।
আরেক বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, তার ভাতিজা মেহেদী হাসানকে ৯ মাস আগে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে বিদেশে পাঠানো হয়। তিনিও বর্তমানে লিবিয়ার কারাগারে রয়েছেন। মুক্তির জন্য আবারও অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামাল মিয়া নামে আরেক স্বজন জানান, তার ভাতিজা উজ্জ্বল আলী লিবিয়ায় ১৮ মাসের কারাদ-ে দ-িত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯ মাস কারাভোগ করেছেন, আরও ৯ মাস বাকি রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, একই গ্রামের অন্তত ছয়জন বর্তমানে লিবিয়ার বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত আব্দুল কাদেরের বাড়িতে গিয়ে তাকে বা তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে কাদেরের মা নুরজাহান বেগম বলেন, তার ছেলে কাউকে জোর করে বিদেশে পাঠাননি। মোখলেছুর রহমানের কাছ থেকে জমির দলিল ও কিছু টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করলেও দাবি করেন, সবাই স্বেচ্ছায় বিদেশে যাওয়ার জন্য তার ছেলের কাছে এসেছিলেন। গ্রামের অনেক মানুষ লিবিয়ার কারাগারে বন্দি থাকার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
স্থানীয়দের দাবি, নিরাপদ অভিবাসনের নামে সক্রিয় মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদেশে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন