শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে ঢাকায় যেভাবে প্রকাশ্যে, দিনের আলোয় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল- যশোরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন হত্যাকাণ্ড সেই একই নকশার নির্মম পুনরাবৃত্তি। মোটরসাইকেলে চড়ে এসে পেছন দিক থেকে মাথায় গুলি করে হত্যার এই কায়দা দেশে রাজনৈতিক হত্যার একটি ভয়ঙ্কর ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং মেথডে’ পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শনিবার (০৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুর ইসহাক সড়কে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়, এটি চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, যা বর্তমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে জনমনে।
নিহত আলমগীর হোসেন যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি মৃত ইন্তাজ আলীর ছেলে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফেরার পথে সাবেক কাউন্সিলর শাহেদ হোসেন নয়নের কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে আরেকটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই দুর্বৃত্ত পেছন থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একটি গুলি তার মাথায় লাগে। ঘটনাস্থলেই তিনি গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের ধরন, সময় ও স্থান নির্বাচন পরিকল্পিত বলেই মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিক ও সচেতন নাগরিকরা। শহরের ব্যস্ত সড়কে, সন্ধ্যার সময়ে, মোটরসাইকেল ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড -সবকিছুই ইঙ্গিত দেয় যে খুনিরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মোটেই শঙ্কিত ছিল না।
নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, আলমগীর হোসেন পেশায় একজন ভূমি ব্যবসায়ী ছিলেন এবং এলাকায় সমাজসেবক ও দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অপরাধের অভিযোগ ছিল না। রাজনৈতিক পরিচয়ই যে তার মৃত্যুর প্রধান কারণ -এমন বিশ্বাস পরিবার ও সহকর্মীদের।
তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে তদন্ত দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আটকে যায় যা এই হত্যার পরও সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা তৈরি করেছে।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে হাসপাতালে এসে বিএনপির খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যশোরে বিএনপির অন্তত ৬৮ জন নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও যদি একই কায়দায় বিএনপি নেতারা হত্যার শিকার হতে থাকে, তবে এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সহিংসতার কাঠামো ভাঙেনি।
সমাজের সচেতন মহল মনে করছে, হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও দৃশ্যমান নয়। সেই অপূর্ণ বিচারই আজ আলমগীর হত্যার মতো ঘটনাকে উৎসাহিত করছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ধারাবাহিক ফল।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রকাশ্যে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা নয়, বরং পুরো বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ভয় দেখানোর কৌশল। দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে এ ধরনের ‘টার্গেট কিলিং’ আরও বাড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন