ইট-পাথরের নগরায়ণ আর জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর রস এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। শীতের সকালে এক গ্লাস টাটকা খেজুর রস এখন অনেক শহুরে মানুষের কাছে এক প্রকার বিলাসিতা। তবে সেই বিলাসিতাকেই সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দিচ্ছেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে আসা অভিজ্ঞ গাছি মো. শহিদ মোল্লা।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হামছাদী এলাকায় তার লিজ নেওয়া খেজুর বাগানে প্রতিদিনই উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গাছি শহিদ মোল্লা জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ও তার সহযোগী রাকিব মিলে ১০ শতাংশ জমির একটি বাগান ৫০ হাজার টাকায় লিজ নিয়েছেন। বাগানে ২৭টি গাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৬৫ লিটার রস সংগ্রহ করা হয়। প্রতি লিটার ১৫০-১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও মানুষের চাহিদা এতই বেশি যে, তিনি অনেককেই খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
শহিদ মোল্লা বলেন, আমি ভোরে এবং রাত ৯টায় গাছ থেকে রস নামাই। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে গাড়ি নিয়ে আসে। কিন্তু বাগান ছোট হওয়ায় সবাইকে রস দিতে পারি না। এই তিন মাসের ব্যবসার উপার্জনেই আমার সারা বছরের সংসার চলে।
বাগানটিতে রস খেতে আসা নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা নাহিদুজ্জামান জনি জানান, ফেসবুকে খবর পেয়ে ভোরেই চলে এসেছি। শহরে এখন চিনি মেশানো বা বাসি রস পাওয়া যায়। এখানে চোখের সামনে গাছ থেকে নামানো টাটকা রস খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। দাম একটু বেশি মনে হলেও স্বাদের কাছে সেটা কিছুই না।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বিজয় বলেন, আগে আমাদের এলাকায় ঘরে ঘরে খেজুর গাছ ছিল। এখন গাছ কমে যাওয়ায় বাইরের জেলা থেকে গাছিরা এসে বাগান ইজারা নিচ্ছে। শহিদ ভাইয়ের রসের মান খুব ভালো, তাই আমরা এলাকাবাসীও মাঝে মাঝে সিরিয়াল দিয়ে রস সংগ্রহ করি।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা হান্নান মিয়া বলেন, ফেসবুকে এই বাগানের ভিডিও দেখে স্ত্রীকে নিয়ে চলে এসেছি। এখন তো আসল খেজুর রস পাওয়াই দুষ্কর। এখানে এসে সরাসরি গাছ থেকে রস নামাতে দেখে মন ভরে গেল। দাম একটু বেশি হলেও এই বিশুদ্ধতা আর টাটকা স্বাদের কোনো তুলনা হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গাছির ব্যবসায়িক পার্টনার রাকিব বলেন, শুরুতে আমরা ভয়ে ছিলাম মানুষ আসবে কি না। কিন্তু এখন অবস্থা এমন যে, প্রতিদিন ভোরে মানুষ সিরিয়াল দিয়ে বসে থাকে। অনেকে আগের দিন রাতে ফোন করে রস বুক করে রাখেন। আমরা চেষ্টা করছি রসের মান ঠিক রাখতে, যাতে সোনারগাঁয়ের সুনাম নষ্ট না হয়।
হামছাদী এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহ (৭০) বলেন, ছোটবেলায় প্রতিটি আইলে আইলে খেজুর গাছ ছিল। ভোরে রসের হাড়ি নামানো ছিল এক উৎসবের মতো। কালের বিবর্তনে গাছ সব কেটে ফেলা হয়েছে। শহিদ মোল্লা আবার সেই পুরোনো দিনের আমেজ ফিরিয়ে এনেছেন। তাকে দেখে অন্যরাও যদি গাছ লাগাত, তবে পরিবেশও বাঁচত, ঐতিহ্যের স্বাদও মিলত।
গৃহিণী তারানা শারমিন খুকি বলেন, পিঠা-পায়েস বানানোর জন্য ভালো গুড় বা রস পাওয়া এখন কঠিন। এখান থেকে রস নিয়ে অন্তত খাঁটি স্বাদের পায়েস রান্না করতে পারছি, এটাই বড় পাওয়া।
এ ছাড়াও কাঁচপুর থেকে আসা তানজিম ইসলাম বাপ্পি বলেন, সকাল ৭টায় এসে দেখি রস শেষ! অথচ শহিদ ভাই বললেন, ফজরের আজানের পরপরই সব রস বিক্রি হয়ে গেছে। রস না পেয়ে একটু খারাপ লাগছে ঠিকই, তবে এই উন্মাদনা দেখে ভালো লাগছে যে, মানুষ এখনো মাটির স্বাদ ভোলেনি।
শহিদ মোল্লা আশা করছেন, মৌসুমে প্রায় ৩ লাখ টাকার রস বিক্রি করতে পারবেন। খরচ বাদে এটি একটি লাভজনক ব্যবসা।
স্থানীয়দের মতে, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এমন আরও বাগান গড়ে উঠলে এবং কৃষি বিভাগ থেকে কারিগরি সহায়তা পেলে সোনারগাঁয়ের খেজুর রস অদূর ভবিষ্যতে একটি লাভজনক কুটির শিল্পে রূপ নিতে পারে।
সোনারগাঁ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাইদ তারেক বলেন, আমরা নিয়মিত কৃষকদের ও গাছ সংশ্লিষ্টদের খোঁজখবর নিচ্ছি। বর্তমানে এই খাতে প্রণোদনা কিছুটা কম থাকলেও স্থানীয়দের খেজুর গাছ রক্ষায় এবং নতুন চারা রোপণে পরামর্শ ও উৎসাহ দিচ্ছি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন