স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবে দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই অধিকার আজও অধরাই রয়ে গেছে। তেমনই একটি এলাকা পাবনার বেড়া উপজেলার যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চল, যেখানে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
উপজেলার প্রায় ২৫টি চরে বসবাসকারী মানুষের জন্য নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও এর মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত ওষুধ বা নিয়মিত চিকিৎসক। ফলে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু কিংবা অপচিকিৎসার শিকার হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরের মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে স্থানীয় ফার্মেসি ও অনভিজ্ঞ চিকিৎসক। অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে নদী পার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মৃত্যু ঘটে। বাধ্য হয়ে অনেকে ঝাড়ফুঁকের মতো অপ্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাটুরিয়া-নাকালিয়া, নতুন ভারেঙ্গা ও পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরনাগদহ, চরপেঁচাকোলা, চরসাফুল্লা, পূর্ব শ্রীকণ্ঠদিয়া, আগবাগসোয়ারচর, চরকল্যাণপুর, পেংগুয়ারচর, দেওলাই, পুকুরপাড়, বোড়ামারা, বক্তারপুর, সিংহাসন, গঙ্গাইদারচর ও ঢালারচরসহ বিভিন্ন চরে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস।
চরের মানুষের একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম নদীপথ। অধিকাংশ বাসিন্দা জেলে ও কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তারা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যে কয়েকটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে, সেখানেও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসক সংকট রয়েছে।
জরুরি রোগীদের বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা কাশিনাথপুরের বেসরকারি ক্লিনিকে নিতে হয়। তবে নদীর প্রতিকূল স্রোত, নৌযানের স্বল্পতা এবং রাতের আঁধারে রোগী পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২০১৩ সালে চরাঞ্চলের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স (ক্লিনিক বোট) সরবরাহ করা হলেও সেটি এখনো চালু করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্করা। গর্ভকালীন পরীক্ষা, নিরাপদ প্রসব ও নবজাতকের চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় অনেক নারী ঝুঁকি নিয়ে ঘরেই সন্তান প্রসব করছেন। এতে মা ও নবজাতকের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া ও জ্বরের প্রকোপও বাড়ছে।
চরনাগদহ গ্রামের বাসিন্দা ফজল মাঝি বলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। ক্লিনিক থাকলেও ঠিকমতো খোলে না, ওষুধও পাওয়া যায় না। গুরুতর রোগী হলে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যায় না।’
আরেক বাসিন্দা বিবি কুলসুম বলেন,‘গভীর রাতে প্রসব ব্যথা উঠলেও নদী পার হওয়া সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে ঘরেই ধাত্রীর সহায়তায় সন্তান প্রসব করতে হয়েছে।’
হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য জাহিদ জানান, চরনাগদহ গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়ভাবে টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হলেও সেখানে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না। দ্রুত নতুন ক্লিনিক নির্মাণ জরুরি।
পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বালাম বলেন, ‘আমাদের পাঁচটি ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে। একমাত্র ভরসা চরকল্যাণপুর কমিউনিটি ক্লিনিক, যেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেই।’
নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ বলেন, ‘নদীভাঙনে ক্লিনিক হারিয়ে গেছে। নতুন করে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ, স্থায়ী চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা এখন সময়ের দাবি।’
এ বিষয়ে বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা সুলতানা নীলা বলেন, ‘চরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন