ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

সরকারকে ‘ফুঙ্গা’ বলে দুঃখপ্রকাশ জামায়াত নেতার, বিএনপির বিবৃতি

​সিলেট ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ৫, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

সিলেটে জামায়াত নেতার দেওয়া অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংশ্লিষ্ট জামায়াত নেতা ইতিমধ্যেই তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও কঠোর নিন্দা জানিয়ে যৌথভাবে পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি দিয়েছে সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি। আলোচিত এই বক্তব্যটি দিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে সিলেট নগরীর ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টে কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে সিলেট মহানগর জামায়াত। দফায় দফায় জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে আয়োজিত উক্ত সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় মাওলানা হাবিবুর রহমান এই আপত্তিকর মন্তব্য করেন।

সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে মাওলানা হাবিবুর রহমান বর্তমান সরকারকে আক্রমণ করতে গিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় চরম অশালীন শব্দ চয়ন করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, যার জন্মের ঠিক থাকে না, তাকে আমরা কী বলি, বলেন কী বলি? যার জন্মের ঠিক থাকে না তাকে আমরা বলি 'ফুঙ্গা' (অবৈধ)। সুতরাং এই সরকারের জন্মের ঠিক নাই। এই সরকার জনগণের ভোটে পাস করে নাই, এই সরকার পাস করেছে ইঞ্জিনিয়ারিং ভোটে—বলেন কথাটা ঠিক কি না।

সিলেটি ভাষায় অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও গালি হিসেবে ব্যবহৃত এই 'ফুঙ্গা' শব্দটি একজন দায়িত্বশীল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে আসায় মুহূর্তের মধ্যে সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়।
এদিকে বক্তব্যটি নিয়ে সিলেটে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে এবং সর্বমহল থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলে অবস্থান থেকে পিছু হটেন জেলা জামায়াতের আমির।

৫ জুন (শুক্রবার) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্যের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। দুঃখ প্রকাশনামায় মাওলানা হাবিবুর রহমান উল্লেখ করেন, গতকাল জ্বালানি তেল-গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সিলেট মহানগর জামায়াত কর্তৃক আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে আমার বক্তব্যে সিলেটি ভাষায় একটি শব্দচয়ন মোটেই ঠিক হয়নি। আমার শুভাকাঙ্ক্ষীসহ অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন। এ জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

বিএনপির বিবৃতি

অপরদিকে জামায়াত নেতার এই ন্যক্কারজনক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে শুক্রবার (৫ জুন) গণমাধ্যমে যৌথ বিবৃতি পাঠিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী এবং মহানগর বিএনপির দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।

​বিবৃতিতে বলা হয়, সিলেট জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান কর্তৃক প্রকাশ্য জনসভায় বর্তমান সরকারকে লক্ষ্য করে যে চরম অশালীন, কুরুচিপূর্ণ ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। সিলেটের মাটির একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য ও আদর্শিক লড়াই সবসময় ছিল, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌজন্যবোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ সিলেটবাসী সবসময় বজায় রেখেছেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জামায়াত নেতার মুখ থেকে যে ভাষায় সরকারকে আক্রমণ করা হয়েছে, তা শুধু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই কলঙ্কিত করেনি, বরং তাঁদের দলের কিছু নেতার ভেতরের চরম হিংসা, পরশ্রীকাতরতা এবং প্রতিহিংসামূলক মানসিকতার আসল রূপটিই জনগণের সামনে উন্মোচন করেছে। 

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যেকোনো সরকারের কাজের সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে। কিন্তু সমালোচনার নামে প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে 'বেজন্মা' বা আঞ্চলিক ভাষায় কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ কোনো সুস্থ ধারার রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল নেতার মুখ থেকে কাম্য হতে পারে না। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ভাষার এই দেউলিয়াত্ব এবং শব্দ চয়নের অসভ্যতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যদিও তীব্র লোকলজ্জা ও সর্বস্তরের মানুষের ক্ষোভের মুখে সংশ্লিষ্ট নেতা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ মানসিকতা সিলেটের রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশকে বিনষ্ট করার একটি অপপ্রয়াস।

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, সরকার বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক ও যৌক্তিক, কোনোভাবেই তা ব্যক্তিগত বা কুরুচিপূর্ণ কুৎসায় রূপ নিতে পারে না। আমরা সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীসহ সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি—আসুন, কাদা ছোড়াছুড়ি ও অশালীনতার রাজনীতি পরিহার করে সিলেটের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যূনতম রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখি। রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা ছড়ানো থেকে সবাই বিরত থাকবেন বলে আমরা আশা করি।