ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বন কর্মকর্তার নাকের ডগায় প্রকল্পের জমি দখল

বান্দরবান প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন বিভাগের ব্লকউড প্রকল্পের জমি দখল করে বিলাসবহুল খামার ও বাগান গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা উক্যজাই মারমার বিরুদ্ধে।

বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে অবৈধভাবে দখল করে রাখলেও বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে বন বিভাগ, এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বনায়ন প্রকল্পের উপকারভোগীরা। মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনায়ন প্রকল্পের অধিকাংশ উপকারভোগীই ম্রো জনগোষ্ঠীর।

লামা বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে সংরক্ষিত বনে বনায়ন সৃষ্টির লক্ষ্যে বন বিভাগের অর্থায়নে ও স্থানীয়দের অংশগ্রহণে ২৫ হ্যাক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালে ওই বাগান নিলামে বিক্রি করে দেয় বন বিভাগ। একই এলাকায় ২০১৬ সালে পুনরায় ব্লকউড প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগ বনায়ন সৃষ্টির লক্ষ্যে আবারও ২৫ হ্যাক্টর পাহাড়ি জমিতে চারা রোপণ করা হয়।

ম্রো উপকারভোগীদের অভিযোগ, ২০১৭ সালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উক্যজাই মারমা ব্লকউড প্রকল্পের পুরো বাগান দখল করে নেন। তৎকালীন বন কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করায় বন বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একপর্যায়ে সংরক্ষিত বনের তুলাতলির পুরো এলাকা দখলে নিয়ে সেখানে ব্যক্তিগত খামার ও বাগান গড়ে তোলেন তিনি। সে সময় উক্যজাই মারমা উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন বলে জানান উপকারভোগীরা।

ব্লকউড প্রকল্পের উপকারভোগীরা জানান, গত আট বছরে শতাধিকবার বন বিভাগে অভিযোগ করলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

মিরিংচরের বাসিন্দা কাইপ্রো ম্রো বলেন, ‘বন বিভাগ ব্লকউড প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের অংশগ্রহণে বাস্তবায়ন হলেও উক্যজাই মারমা সেই প্রকল্পের জায়গা দখল করে নিয়েছে। প্রকল্প, জায়গা ও গাছ সবকিছু বন বিভাগের তবুও অভিযোগে করে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এতে আমাদের পাশাপাশি সরকারও বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।’

একই এলাকার আরেক বাসিন্দা মেনপয় ম্রো বলেন, ‘পরম্পরায় আমরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাসকারী ভূমিহীন জনগোষ্ঠী। আমাদের চাষাবাদের জমি বনায়ন প্রকল্পের কথা বলে নেওয়া হলেও পরে আওয়ামী লীগ নেতা সেটি দখল করে খামার গড়ে তুলেছেন। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত বনে এসব করা সম্ভব নয়। সরকারি টাকায় করা বনায়ন প্রকল্প ধ্বংস হলেও বন বিভাগ নীরব দর্শক হিসেবে আছে। এটি গোপন সমঝোতা ছাড়া সম্ভব নয়।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘উক্যজাই মারমা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের স্বঘোষিত রাজা। বন বিভাগ তার বিরুদ্ধে যেতে ভয় পায়। তদন্ত হলেও টাকার মাধ্যমে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের শিকার হতে হয় হামলা-মামলার হুমকির।’

অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সর্দার উক্যজাই মারমা বলেন, ‘সরকার আমাকে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাঁচ একর জমি বাগান করার জন্য দিয়েছে। আমার মতো আরও ১২৪ পরিবারকে চাষের জন্য জমি দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রিজার্ভে শত শত একর জায়গা দখল হয়েছে। আমি একা দখল করিনি। উচ্ছেদ করলে সবাইকে করুক।’

মাতামুহুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মালেক এ দাবি নাকচ করে বলেন, ‘পুনর্বাসন তালিকায় উক্যজাই মারমার নাম নেই। পুনর্বাসন শুধুমাত্র ম্রো জনগোষ্ঠীরদের করা হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বাগান করার জন্য সরকার কাউকে জমি দেয়নি।’

লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে প্রয়োজন হলে উচ্ছেদ করা হবে।