শহরের ব্যস্ত সড়কে গুলিবিদ্ধ একটি ডাহুক মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। সেই দৃশ্য থমকে দেয় পথচারী এবং দুই সাংবাদিককে। প্রাণীটির জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসার আগেই পালিয়ে যান শিকারিরা, যারা সাধারণ মানুষ নন, বরং আইন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কারারক্ষী।
বরগুনায় এয়ারগান দিয়ে পাখি শিকারের অভিযোগ উঠেছে বরগুনা জেলা কারাগারে কর্মরত দুই কারারক্ষীর বিরুদ্ধে। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সকাল থেকে বরগুনা পৌর শহর ও আশপাশের এলাকায় মোটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে পাখি শিকার করেন তারা।
বেলা ১১টার দিকে পৌর শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আঃ কাদের সড়কে একটি ডাহুক শিকার করার সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার মোঃ সাইফুল ইসলাম মিরাজ এবং ভিডিও জার্নালিস্ট রুবেলের চোখে পড়ে ওই দুই কারারক্ষী। তখন এক হাতে এয়ারগান, অন্য হাতে গুলিবিদ্ধ পাখি—দৃশ্যটি দেখে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ জানান এবং ভিডিও ধারণ শুরু করেন।
পরিচয় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিকারিরা ব্যাগ ভর্তি পাখি ও এয়ারগান নিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেলে পালিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মোটরসাইকেলে অন্তত ২৫টি পাখি ছিল।
অভিযুক্ত দুই কারারক্ষী হলেন মোঃ হাফিজুর রহমান (কারারক্ষী) এবং মোঃ রফিকুল ইসলাম (সহকারী প্রধান কারারক্ষী)। দুজনই বরগুনা জেলা কারাগারে কর্মরত।
রিপোর্টার মোঃ সাইফুল ইসলাম মিরাজ বলেন, “ডাহুকটি তখনও বেঁচে ছিল এবং মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। দৃশ্যটি আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমরা দায়িত্ববোধ থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছি।”
একুশে টেলিভিশনের বরগুনা প্রতিনিধি জয়দেব রায় জানান, অভিযুক্ত সহকারী প্রধান কারারক্ষী মোঃ রফিকুল ইসলাম এর আগেও এয়ারগান দিয়ে পাখি শিকারের সময় সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে পড়েছিলেন। তখন তিনি আর পাখি শিকার করবেন না বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এবার সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন।
পরিবেশকর্মীরা ঘটনাটিকে গভীর উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন। বরগুনার পরিবেশকর্মী মুশফিক আরিফ বলেন, “বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এয়ারগান দিয়ে পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। যারা আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকেন, তাদের জন্য শাস্তি সাধারণ মানুষের তুলনায় কঠোর হওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহকারী প্রধান কারারক্ষী মোঃ রফিকুল ইসলামের ফোনে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে কারারক্ষী মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, “আমি ছুটিতে ছিলাম। রফিকুল ইসলাম ডেকে নেওয়ার পর তার সঙ্গে বের হয়েছিলাম। পাখি শিকার তিনি করেছেন।
বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দিয়েছেন, এয়ারগান জব্দ করেছেন এবং আমার কাছ থেকেও লিখিত জবাব নিয়েছেন।”
বরগুনার বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, “বিষয়টি জানা গেছে, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অপরিসীম। অথচ যাদের হাতে আইনের চাবিকাঠি, তাদের হাতেই যদি ঝরে যায় পাখির প্রাণ, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—আইন আসলে কাকে রক্ষা করছে?


