গভীর রাতে বরিশাল শহরে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ ব্যাপক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কোতয়ালি থানাধীন শহরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের রিফিউজি কলোনিতে রুবেল ও রকি নামের দুটি গ্রুপ সদলবলে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে উত্তেজনা ও আতঙ্ক তৈরি হয়।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকের এই ঘটনার বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ পেয়েছে, যা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা পুলিশের সঙ্গে সেনাবাহিনীও সংঘর্ষে জড়িত সন্ত্রাসীদের ধরতে ইতিমধ্যে তৎপরতা শুরু করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, সংঘাতে লিপ্ত ত্রিশোর্ধ্ব রুবেল ও রকির দুটি গ্রুপই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলের পুরো সময়জুড়ে স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তার করে মাদক বাণিজ্যসহ বহুমুখী অপরাধ করে আসছিল। বিভিন্ন ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও চলমান রয়েছে।
বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কলোনির এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা এক ধরনের ফিল্মি স্টাইলে অস্ত্রের মহড়া দেয়। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোসহ পিস্তল নিয়ে গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়লে গোটা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আতঙ্কে পথচারীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। ভিডিওচিত্রেও অনুরূপ বাস্তবতা প্রতীয়মান হয়, যা সাধারণ মানুষকে হতবাক ও বাকরুদ্ধ করে এবং পুলিশ প্রশাসনকে চিন্তায় ফেলে দেয়।
স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রথম কিছুদিন দুটি গ্রুপ নিশ্চুপ থাকলেও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যকার শীতল দ্বন্দ্ব চলছিল। উভয় গ্রুপই যে যার মতো করে মাদক বাণিজ্যসহ সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে আসছিল। সপ্তাহখানেক আগে কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে রকি ও রুবেল লোকজন সংগঠিত করতে থাকেন। সেই লোকজন নিয়েই বুধবার রাতে দুটি গ্রুপ সংঘাত ও গোলাগুলিতে জড়িয়ে গোটা শহর আতঙ্কিত করে তোলে।
অভিন্ন তথ্য দিয়ে স্থানীয় অপর একটি সূত্র জানায়, বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর অনুসারী রকি ও রুবেল যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, তার পূর্বাভাস আগেই পাওয়া গিয়েছিল। কিছুদিন ধরে তারা একে অপরকে গালাগালি করাসহ অস্ত্র সংগ্রহে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিল, যা দেখেই বিষয়টি অনুমান করা যায়। শেষ পর্যন্ত তারা সংঘাতে জড়িয়ে গুলি বিনিময়ের মাধ্যমে শহরময় আতঙ্ক সৃষ্টি করে, যা পুলিশের ঘুমও হারাম করে দেয়।
এই দুটি সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় আনতে পুলিশ প্রশাসনের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দুটি গ্রুপের ৩০-৪০ জন যুবক মিলে কলোনিটিকে একটি মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছে এবং এ নিয়ে প্রতিদিনই সংঘাত-সংঘর্ষ হচ্ছে। সর্বশেষ বুধবার রাতে এই সংঘাত ককটেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলিতে রূপ নেয়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার রাতে ঘটনার পরপরই পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। তবে এর আগেই সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে কোতয়ালি মডেল থানার ওসি মামুন উল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ শেষে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেছে। দুটি গ্রুপপ্রধান রুবেল ও রকিসহ জড়িত সবাইকে ধরতে পুলিশ কাজ করছে।
অবশ্য এই আলোচিত ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আগেই কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বুধবার রাতে দুটি গ্রুপের অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলির ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।
তিনি রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদককে জানান, বিষয়টি মাঠপর্যায়ের পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে কলোনিটিতে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছে।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন