হাম বা রুবিওলা রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বরিশালে ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভাগের ছয়টি জেলার সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সোমবার বিকেল পর্যন্ত ৭৭ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মর্মান্তিক বিষয় হলো, ভাইরাসজনিত এই রোগে গত তিন মাসে বরিশালে সাতজন শিশু মারা গেছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, ভীতি ও শঙ্কা বিরাজ করছে।
বিশেষ করে হাম প্রাণঘাতী রোগে পরিণত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগ নড়েচড়ে বসেছে এবং এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে দ্বীপ জেলা ভোলা জেলায় হামের টিকা সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম (মিজলস) বা রুবিওলা একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং তীব্র ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসযন্ত্রকে আক্রমণ করে। এটি মিজলস মর্বিলিভাইরাস নামক এক ধরনের ভাইরাসের কারণে হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শিশুরাই এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিও থাকে।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বরিশাল বিভাগজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে সাতজন শিশু মারা গেছে। একই সময়ে বিভাগজুড়ে ২০৬ জন শিশুর দেহে অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। সোমবার বিকেল পর্যন্ত বিভাগের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৭৭ জন শিশু। প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
বরিশাল বিভাগের বাসিন্দাদের চিকিৎসার ভরসাস্থল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে গত তিন মাসে ১৩০ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়। এর মধ্যে শুধু মার্চ মাসেই আক্রান্ত হয় ৮৯ জন। সোমবার দুপুর পর্যন্ত এই হাসপাতালে ৩৪ জন হাম আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন ছিল। এর আগে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) শেবাচিম হাসপাতালে বানারীপাড়ার ওমর নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এছাড়া সোমবার সকালে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশু মারা যায়।
ভাইরাসজনিত এই রোগে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি আছেন বরিশাল সদর উপজেলার কর্নকাঠি এলাকার বাসিন্দা রহিমা তালুকদার। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাত দিন আগে তার ৯ মাসের কন্যাশিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করান। প্রথমে জ্বর মনে হলেও পরে চিকিৎসকরা তা হাম বা রুবিওলা বলে শনাক্ত করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনই হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালগুলোতেও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে।’
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনির বলেন, ‘শিশুদের হামের টিকা ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তবে বর্তমানে ৭ মাস বয়সী শিশুদেরও এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। ওয়ার্ডে বেড সংকট ছিল, তা ইতিমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত সুস্থ করতে চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’
হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও ভীতি তৈরি হয়েছে- এ কথা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডলও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘হাম বা রুবিওলা একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও তীব্র ভাইরাসঘটিত রোগ। প্যারামাইক্সোভিরিডি গোত্রের মর্বিলিভাইরাস গণের অন্তর্গত এই ভাইরাসের কারণে রোগটি হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি বাতাসে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগীর সঙ্গে একই ঘরে থাকলেও সংক্রমণ হতে পারে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে শিশুদের নিরাপদে রাখতে হবে। যেকোনো বয়সের মানুষেরই এ রোগ হতে পারে।’
প্রাণঘাতী এই রোগের টিকা বরিশালের পাঁচটি জেলায় মজুত থাকলেও দ্বীপ জেলা ভোলা জেলায় সংকট রয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে বিভাগের শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা শ্যামল বলেন, ‘সোমবার সেখানে টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। কোথাও সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে টিকা পাঠানো হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে হাম বা রুবিওলা প্রতিরোধে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অধিক সুরক্ষার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।’



