ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেড়েছে হাম রোগের প্রকোপ, চারজনের মৃত্যু

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ৩০, ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
হাসপাতালে বেড না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে হাম রোগীরা। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ভাইরাসজনিত রোগ হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন মাসে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেইসঙ্গে ৬ শতাধিক শিশু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা হাসপাতালে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। হামসহ অন্যান্য শিশুরোগ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকসহ স্টাফরা হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসাসেবা দিতে। তবে রোগীরা জানিয়েছেন, তারা এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭২ জন ভর্তি আছেন। তার মধ্যে ৩৯ জন ছেলে এবং ৩৩ জন মেয়ে শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। একজনকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হয়েছে।

এ ছাড়াও ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১০ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। ১৪৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাম বাদে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭০ জন শিশু চিকিৎসাধীন।

এদিকে রোগীর চাপ এতই বেশি যে, অনেক শিশুকে শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে আইসোলেশন ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি থাকায় আক্রান্ত শিশুদের পুরোপুরি আলাদা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য রোগ নিয়ে আসা শিশুরাও হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সংক্রমিত হচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) নিশ্চিত করা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ বলেও জানান তারা। 

জেলা হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৯৫ ভাগ শিশুকে পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে যাদের শ্বাসকষ্ট আছে অক্সিজেন ডিপেন্টেন্ড ও আইসোলেশনের দরকার তাদের রাজশাহীতে রেফার্ড করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার টিকরামপুর এলাকার মলি খাতুন বলেন, আমার মেয়ের কিছুদিন আগে হাম হয়েছিল। পরশুদিন থেকে অনেক জ্বর। গতকাল সকালে খিচুনিসহ জ্বর ছিল। পরে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছি। ইনজেকশন দিয়েছে ও ওষুধ চলছে। আজ রাত থেকে আল্লাহর রহমতে জ্বর নেই। বর্তমানে বাচ্চা ভালো আছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, এই সিজনে তিন মাস আগে আমরা প্রথম হামের রোগী আইডেন্টিফাই করেছিলাম। সে সময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারজন শিশু ভর্তি হয়েছিল। তারা মূলত নিউমোনিয়া রোগের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু পরে আমরা বুঝতে পারি এটা হাম। 

এরপর থেকে প্রকোপটা বাড়তে থাকে। দুই মাস আগে যখন প্রকোপটা বেড়ে গেল। তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে, প্রকোপটা আরও বেড়ে যাবে। ফলে তখন আমরা আলাদাভাবে আইসোলেশনের একটা ওয়ার্ড চালু করেছি। প্রায় ২০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড। আর ফ্লোরিং মিলে এই হাসপাতালে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। গত এক মাসে এখানে ৫০ এর অধিক হামের বাচ্চা ভর্তি থেকেছে।

এ ছাড়াও গতকাল যখন রাউন্ড শুরু করি তখন ৭০ এর অধিক বাচ্চা ভর্তি ছিল। ২০ থেকে ৩০টি বাচ্চাকে ছুটি দিয়েছি। আজকে আশির অধিক ভর্তি আছে। এভাবে হামের প্রকোপ মারাত্মকভাবে বাড়ছে। 

তিনি বলেন, এটা মারাত্মক ছোঁয়াছে রোগ হওয়ার কারণে অনেক বাচ্চা টিকা নেয়নি। ফলে ৯ মাসের নিচের বাচ্চা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটার মৃত্যুহারও যথেষ্ট বেশি এবং এটাতে কম্পিকেশনের হারও বেশি। আমাদের সদর হাসপাতালে যে বাচ্চা ভর্তি হচ্ছে তার মধ্যে ৯৫ ভাগ বাচ্চাকে চিকিৎসা দিতে সক্ষম। কিন্তু যেগুলো আইসিইউ লাগার মতো অবস্থা ও শ্বাসকষ্ট অতিরিক্ত হচ্ছে, অক্সিজেন ডিপেন্টডেন্ট সেই বাচ্চাগুলোকে আমরা রাজশাহীতে পাঠাচ্ছি। এ পর্যন্ত গত তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা গেছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন এবং চলতি মার্চ মাসে দুজন মারা গেছে। গত তিন মাসে ৬ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে।
 
তিনি আরও বলেন, হাম এমন একটা মারাত্মক রোগ যা ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও দুই থেকে তিন মাস এই বাচ্চাগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে কমে যায়। এই কারণে হাম ভালো হয়ে যাওয়ার পরও সেই বাচ্চার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে আরও তিন মাসের বেশি সময় লাগতে পারে। এ জন্য তাদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো ও তাদের প্রতি এক্সটা যত্ন নেওয়া দরকার। আর অসুস্থতা এড়ানোর জন্য যেটা করণীয় সেটা হলো টিকা নিতে হবে। গত তিন থেকে চার বছরে অনেক বাচ্চা হামের টিকা মিস করার কারণে এবার হামের মহামারি দেখা গেছে। কেন মিস করেছে সেটার অনেক ব্যাখ্যা আছে। হাম আক্রান্ত হয়ে গেলে বাচ্চাগুলোকে আইসোলেশনে রাখতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বাচ্চাদের যেতে না দেওয়া। এ ছাড়াও আরেকটি ভয়ের বিষয় হলো- গত এক সপ্তাহ থেকে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে। তাই হাম আর ডেঙ্গু একসঙ্গে শুরু হলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে আল্লাহ্ ভালো জানেন।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারা দেশে হাম রোগের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সদর হাসপাতালে আজকে টোটাল রোগী ৫৭১ জন। তার মধ্যে ২৩১ জনই শিশু। এর মধ্যে ৭১ জন হচ্ছে হাম রোগে আক্রান্ত। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী থাকার কথা ছিল তার চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ বেশি রোগী ভর্তি আছে। এই আড়াইগুণ রোগীর প্রায় ৪০ ভাগই শিশু। আমরা জানুয়ারি মাসের দিকে হাম রোগী পাই।

তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে একটি ইউনিট আছে যা কিডনি বা ডায়ালাইসিস ইউনিট হিসেবে ছিল। পরে আমরা সেই ইউনিটকে হাম ইউনিট করেছি। হাম এমন একটা রোগ যা সহজেই এক শিশু থেকে আরেক শিশুকে আক্রান্ত করে থাকে। তাই তাদের আলাদা করার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড করেছি। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই আমাদের এই আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু আছে। আক্রান্তদের ভিটামিন (এ)’সহ পূর্ণাঙ্গ চিৎকিসা দেওয়া হচ্ছে।