ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট

পেকুয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২২, ২০২৬, ০৩:০২ পিএম
পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তীব্র জনবল সংকটে ধুঁকছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল নিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে চরম চাপে পড়েছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। জনবল ঘাটতির কারণে বন্ধ রয়েছে এনআইসিইউ সেবাসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু কার্যক্রম।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৩১ শয্যার কার্যক্রম চলমান থাকলেও চিকিৎসকের অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। বাকি ৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। নার্সের ২৫টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন, খালি রয়েছে ১৩টি পদ।

ওয়ার্ড বয়ের ১৮টি পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। ক্লিনারের ২০টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। এ ছাড়া প্যাথলজিস্ট রয়েছেন মাত্র একজন।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে সৌদি আরব সরকারের অর্থায়নে একটি প্রকল্পের আওতায় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদের প্রচেষ্টায় ২০ শয্যা বিশিষ্ট পেকুয়া হাসপাতাল হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হয়।

উপজেলা প্রতিষ্ঠার পর এটি পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রূপ নেয়। ২০০৭ সালে হাসপাতালটি ৩১ শয্যায় উন্নীত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি ৫০ শয্যার ঘোষণা দেওয়া হলেও জনবল নিয়োগ হয়নি।

৩১ শয্যার জনবল দিয়েই বর্তমানে চলছে হাসপাতালটি। অথচ পেকুয়া উপজেলা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ৬৮ কিলোমিটার এবং কক্সবাজারের দূরত্ব ৭২ কিলোমিটার। ফলে প্রান্তিক এই উপজেলার মানুষের রোগবালাই ও জরুরি চিকিৎসার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ২ লাখ ৬৫ হাজার ১১ জন। নিয়মিত ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৪ হাজার ৫৫৭ জন এবং জরুরি সেবা নিয়েছেন ৩৯ হাজার ৩৫০ জন রোগী। চিকিৎসক সংকট সত্ত্বেও এত বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিয়ে নজির স্থাপন করেছে হাসপাতালটি।

১৩৯ দশমিক ৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পেকুয়া উপজেলায় বসবাস করেন ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৭ জন মানুষ। কৃষি, মৎস্য ও লবণ চাষনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষ নদী ও সাগরকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ভৌগোলিক কারণে চিকিৎসাসেবার দিক থেকে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. তাহমিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে সাধারণ রোগ থেকে শুরু করে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরাও আসেন। পাশের উপজেলা চকরিয়ার বদরখালী, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া এবং বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ও ছনুয়া এলাকার রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। আমাদের সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে, ফলে আমরা মারাত্মক জনবল সংকটে ভুগছি।’

প্রসূতি সেবায় বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২০২৫ সালে এখানে এক হাজার ৮১৮ জন প্রসূতি সন্তান প্রসব করেছেন। এর মধ্যে ৮৭টি ছিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। নরমাল ডেলিভারির জন্য এলাকাবাসীর আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে এই হাসপাতাল।

গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহনাজ পারভীন বলেন, এই উপজেলায় মাসে গড়ে প্রায় ৫০০ শিশুর জন্ম হয়। এর মধ্যে অন্তত ২০০ শিশুর জন্ম হয় পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এখানে ৯৫ শতাংশের বেশি নরমাল ডেলিভারির রেকর্ড থাকায় রোগীর চাপ অনেক বেশি।

শিশু ওয়ার্ডের নার্স মাহফুজা আক্তার জানান, নার্স সংকটের কারণে দিন-রাত তিন শিফটে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলায় বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার এস এম তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একা হাতে এত রোগীর জরুরি সেবা দিতে গিয়ে অনেক সময় আমরাই অসুস্থ হয়ে পড়ছি।’

রাজাখালী থেকে আসা রোগী আসমা বেগম বলেন, ‘সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি, সাড়ে ১০টা বাজলেও টিকিট পাইনি। রোগীর চাপ অনেক।’

কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালে ডায়াগনস্টিক সেবা নিয়েছেন ৩৭ হাজার ২৩৩ জন। জনবল না থাকায় বাইরে থেকে ভাড়ায় টেকনিশিয়ান এনে কাজ চালাতে হচ্ছে। হাসপাতালের অন্তত ১০টি টয়লেট অপরিষ্কার দেখা গেছে। মাত্র দুই জন ক্লিনার এত বড় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার রোগীর চিকিৎসা দিতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনবল সংকট। একজনকে দিয়ে তিন-চার জনের কাজ করাতে হচ্ছে। বিষয়টি বহুবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া যায়নি।’