বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে খ্যাত কক্সবাজারের কলাতলি ও সুগন্ধা পয়েন্টে বালিয়াড়ি দখল করে প্রতিদিনই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও পরিবেশবাদী আইন অমান্য করে নতুন নতুন অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ঘটনাগুলো শঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে সৈকত শুধু পর্যটক নয়, পরিবেশবাদীদের মতে ‘প্রাকৃতিক অভয়াশ্রম’ হিসেবেও সংকটে পতিত হবে।
গত কয়েক মাসে সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে প্রায় ১৫০টি দোকান/ভ্রাম্যমাণ স্থাপনা রাতের আঁধারে নির্মিত হয়েছে, যেখানে আগে বিস্তীর্ণ খালি বালিয়াড়িই ছিল।
একদিনে ৫০টিরও বেশি অবৈধ দোকান/স্টলই প্রশাসনের উদ্যোগে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে রক্ষিত হয়নি।
সৈকত এলাকায় নতুন নতুন ভবন, দোকান, কাঠ বা টিনের ছাউনি তৈরির প্রবণতা আছে, যা ইসিএ আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ আদালত কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি দখল ও বাণিজ্যিক অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখানেই আবার নতুনভাবে দোকান এবং স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলেই স্থানীয় নাগরিক ও পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করেছেন।
উদ্ভট দিকটি হচ্ছে, অনেক স্থাপনার মালিকেরা এসব নির্মাণ রাতে ঘন করে তোলে এবং প্রশাসনিক নজরদারি শেষ হওয়ার পরে আবার স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আজিম খান বলেন, ‘সৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধ দোকান বা স্থাপনা বসানো যাবে না, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও আছে। ফলে এ বিষয়ে কঠোর মনিটরিং বজায় রাখার চেষ্টা রয়েছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের এডিশনাল ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘ইসিএ এলাকা ও আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কেউ যদি বালিয়াড়িতে দোকান স্থাপন করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্টদের নিজ উদ্যোগে তা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এসব কথাই সর্বদা কার্যকরভাবে অনুসরণ হচ্ছে না; উচ্ছেদ অভিযান শেষ হতেই আবারও স্থাপনার পুনরায় নির্মাণ শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।’
তিনি বলেন, ‘এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পর দখলবাজ সিন্ডিকেট ট্যুরিস্ট পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সাল থেকে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত ইসিএ (Ecologically Critical Area) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে সেখানে প্রকৃতিতে ক্ষতিকর কোন নির্মাণ কার্যই অনুমোদিত নয়।
উচ্চ আদালত ইতোমধ্যেই বালিয়াড়িতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে নির্দেশ জারি করেছে; কিন্তু তা নিয়মিতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
পরিবেশবিদদের মতে, বালিয়াড়ির অখণ্ডতা রক্ষা না হলে, সামুদ্রিক ভূমি স্তরায়ন বিপন্ন হতে পারে। বালু-পাথরের স্বল্পস্থায়ী বাধা দুর্বল হবে। সৈকতের নান্দনিক সৌন্দর্য হ্রাস পাবে, পর্যটকদের অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও জানান, পর্যটকদের ভিড় থাকার পরও অবৈজ্ঞানিক স্থাপনা ও বালিয়াড়ি দখল তাদের ব্যবসার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ উচ্চমানের পর্যটকদের আকর্ষণে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।
স্থানীয়দের ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ একযোগে দখলদারের সিন্ডিকেট বন্ধে কঠোর অভিযান শুরু করুক। বিচারিক পর্যায়ে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালানো হোক। বালিয়াড়ি রক্ষার জন্য উন্নত মনিটরিং ও সাধারণ পর্যটকদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা হোক।

