দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে মিনিকেট ছাড়া অন্যান্য মোটা চালের দাম কমলেও ডাল, সবজি ও মাছ-মাংসসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট এবং সোনালি (পাকিস্তানি) মুরগির লাগামহীন দামে সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠেছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, ফুলবাড়ী পৌর বাজারে নিত্যপণ্যের দামের অস্থিরতা চলছে। একদিকে প্রশাসনের টাঙানো মূল্য তালিকা ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও, অন্যদিকে সরবরাহ সংকট ও দরদামের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, টাকা দিয়েও মিলছে না ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল। সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি বা পাকিস্তানি মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকার বেশি বেড়ে যাওয়ায় আমিষের বাজারেও তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে।
সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সয়াবিন তেলের সঙ্গে অন্য পণ্য ট্যাগিং করে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এতে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে ভুগছেন মধ্যবিত্তরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন পরিবেশক জানান, কোম্পানিগুলোর নানা শর্তের কারণে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট তৈরি হচ্ছে। তেল কিনতে গেলে সঙ্গে একই কোম্পানির চাল, ডাল, চিনি, সুজি, লবণসহ অন্যান্য পণ্য নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
এসব পণ্যের চাহিদা কম থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এতে অনেক স্থানীয় ব্যবসায়ী পরিবেশকের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন বলেও জানান তারা।
ফুলবাড়ী বাজারের ব্যবসায়ী উত্তর সরকার বলেন, আগে যেখানে দোকানে প্রায় ১ লাখ টাকার সয়াবিন তেল বিক্রি হতো, এখন সরবরাহ সংকটে তা কমে ২৫ হাজারে নেমে এসেছে।
খুচরা বিক্রেতা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ১ লিটার রূপচাঁদা তেল ১৯২ টাকায় কিনে ১৯৫ টাকায়, ২ লিটার ৩৮৪ টাকায় কিনে ৩৯০ থেকে ৩৯৫ টাকায় বিক্রি করছি। কিন্তু ৫ লিটারের বোতল এক হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। তেলের সংকটের কারণে চিনি ও ডালের বাজারও বেড়ে গেছে।
তিনি আরও জানান, গত সপ্তাহে ১০০ টাকার চিনি এখন ১০৩ থেকে ১৫০ টাকা এবং ১৩০ টাকার মসুর ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
আমিষের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সোনালি মুরগির দাম গত এক সপ্তাহে কেজিতে ১০০ টাকার বেশি বেড়েছে। বর্তমানে এটি ৩৩০ থেকে ৩৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে দেশি মুরগির দাম ৪৫০-৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫০ টাকা কেজি হয়েছে।
পৌর বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন, মোজাফফর হোসেন ও শের আলী বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তন ও রোগবালাইয়ের কারণে অনেক মুরগি মারা যাচ্ছে। এর ওপর সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৫৫-১৬০ টাকা এবং লেয়ার ৩০০-৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাছের বাজারে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও ইলিশের দামে ক্রেতাদের ক্ষোভ রয়েছে। ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৫০০ টাকা এবং ১ কেজি ওজনের ইলিশ ১৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য মাছের মধ্যে রুই ৩৫০, কাতলা ৩২০, টেংরা ৬০০, বোয়াল ১০০০, শোল ৭০০, মাগুর ৬০০ এবং পুঁটি ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সবজি ব্যবসায়ী হারুন উর রশীদ জানান, সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দামও বেড়েছে। বেগুন ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা, টমেটো ও পেঁপে ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু ১৮-২০ টাকা এবং পেঁয়াজ ২৮-৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা ১৬০ টাকা ও রসুন ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সয়াবিন তেলের সংকটের নেপথ্যে ‘ট্যাগিং বাণিজ্য’কে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। ফুলবাড়ী থানা ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক মো. আব্দুল কাইয়ুম আনসারী বলেন, বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি ছাড়াও তেলের সঙ্গে অন্য পণ্য চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা বাজার মনিটরিং কমিটির সভাপতি আহমেদ হাছান বলেন, “কেউ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দিনাজপুরের সহকারী পরিচালক মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।


