ফেনীতে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যে কোনো সময় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এদিকে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের মনে নতুন করে জেগে উঠেছে বন্যা ও বাঁধ ভাঙনের আতঙ্ক।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙন এখানকার মানুষের জন্য নিয়মিত অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। গত দুই বছরেও ভয়াবহ বন্যায় চরম ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। এবারও নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় শ্রীপুর, জগতপুরসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা নুর মিয়া জানান, বর্ষা এলেই আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি হলে যেকোনো মুহূর্তে ঢল নেমে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
একই উপজেলার জগতপুর এলাকার বাসিন্দা আবুল বশর বলেন, গত কয়েক বছরের বন্যায় আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত করা না হলে এবারও রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে। আমরা চাই সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হোক।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর ৩টায় মুহুরী নদীর পানির স্তর রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৪৫ মিটার, যা বিপৎসীমার (১২ দশমিক ৫৫ মিটার) ১ দশমিক ১০ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো পানির বৃদ্ধির গতি। সকাল ৬টায় যেখানে পানির স্তর ছিল ৯ দশমিক ৩৫ মিটার, সেখানে মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে দুপুর ৩টার মধ্যে তা ২ মিটার বেড়ে ১১ দশমিক ৪৫ মিটারে পৌঁছায়। রাত ৮ টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৫৮ মিটারে।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান জানান, সোমবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে আগামীতে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমে আসতে পারে বলে আভাস দেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম পরিস্থিতির তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, এবারের পানি বৃদ্ধির ধরনটা কিছুটা ব্যতিক্রম। গত কয়েক দিন ধরে পানি বাড়লেও আবার কমে যাচ্ছিল, কিন্তু আজ সকাল থেকে পানি অত্যন্ত দ্রুত বাড়ছে। পানি যদি বিপৎসীমা অতিক্রম করে, তবে বাঁধের নতুন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হতে পারে। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও বাঁধ রক্ষায় আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও জরুরি সামগ্রী মজুত রয়েছে।
স্থানীয়রা দাবি জানান, সম্প্রতি একনেকে (ECNEC) অনুমোদন পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৫৪২, কোটি ১৬ লাখ টাকার ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়। এই স্থায়ী প্রকল্পটি দ্রুত শুরু হলে নদীতীরবর্তী মানুষের দীর্ঘদিনের এই আতঙ্কের অবসান ঘটবে।

