স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, শূন্যপদ, ওষুধ ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের প্রশ্নের মধ্যেই সরকার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী এ ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এমন ঘোষণা একাধিকাবার দেওয়া হয়েছিল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে দ্রুতই এই নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া হযবরল এই খাতটিতে কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন লোক নিয়োগ কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে যেখানে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের মতো বড় বড় অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে দিনের পর দিন। নিয়োগ পেয়েও চিকিৎসকরা হচ্ছেন শহরমুখী। গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা একেবারেই নাজুক রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজে ধারণক্ষমতার চেয়ে ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যাসংকট প্রকট থাকা অবস্থায় সরকারের বারবার নতুন লোক নিয়োগের ঘোষণাকে অনেকটাই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো পরিকল্পনা বলে মত তাদের।
সোমবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। এই সংকট কাটাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪১ হাজার ৮০৬টি। এর মধ্যে বর্তমানে ৯ হাজার ৪০৭টি পদ শূন্য। এ ছাড়া নার্সদের জন্য অনুমোদিত ৪৯ হাজার ৮৭৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৪৫ হাজার ৩০২ জন। ফলে বর্তমানে ৪ হাজার ৫৭৭টি নার্সের পদও শূন্য। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় জনবল ঘাটতি পূরণ এবং সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দ্রুত এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীই সংসদে স্বীকার করেছেন যে, সবচেয়ে বেশি জনবল সংকট রয়েছে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে। এ খাতে অনুমোদিত ৬৫ হাজার ২৩০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত ৪৬ হাজার ২৮৩ জন। ফলে শূন্য ১৮ হাজার ৯৪৭টি পদ।
যার প্রমাণ মিলে দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় অন্যতম বড় সংকট চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিনই হাজারো রোগী কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক স্থানে চিকিৎসক পদায়ন থাকলেও তারা কর্মস্থলে নিয়মিত থাকেন না। ফলে সাধারণ রোগীদের বাধ্য হয়ে জেলা সদর, বিভাগীয় হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামে চিকিৎসকদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে এক লাখ কেন, কয়েক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করলেও কোনো সুফল পাবে না সাধারণ মানুষ। রাজধানীতেই বাড়বে চাপ। বিশেষ করে রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালগুলোর মতো বড় হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে যে চাপ রয়েছে, যদি চিকিৎসকদের গ্রামে থাকা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই চাপ দিন দিন বাড়তেই থাকবে।
পদ আছে, চিকিৎসক নেই
স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বহু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের উল্লেখযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আবার অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক পদায়ন থাকলেও প্রশিক্ষণ, প্রেষণ, উচ্চশিক্ষা বা প্রশাসনিক দায়িত্বের কারণে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে নিয়মিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, প্রসূতি সেবা, শিশুস্বাস্থ্য এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো ব্যাহত হচ্ছে। তাই যাদের নতুন নিয়োগ দেয়ো হবে, তাদের গ্রামে, বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা দিতে হবে- এমন নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা জরুরি উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। দিনের পর দিন চিকিৎসকরা শহরের বড় বড় হাসপাতালগুলোতেই থাকতে চান। ফলে গ্রামের রোগীরা দীর্ঘদিন যাবৎ বঞ্চিত হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসকেরা একপ্রকার স্বেচ্ছাচারী হয়ে গিয়েছিলেন। এখন নতুন সরকারের অধীনেও যদি চিকিৎসকদের গ্রামে থাকার মনোভাব না থাকে বা সরকারের এ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে সেবা কার্যক্রম যা ছিল তা-ই থাকবে। বারবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। কিন্তু তাদের বক্তব্যে কোথাও বলা হয়নি, তারা কীভাবে কোথায় কাজ করবে, সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথা। এমন যদি হয় যে, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চিকিৎসক। তাহলে তাদের দুজনকে একই জায়গায় পোস্টিং দিলে তারা ঢাকায় আসতে চাইবে না। তাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাবিহীন লোক নিয়োগ দিলেই উদ্দেশ্য হাসিল হবে বলে আমার মনে হয় না।
রোগীদের ভোগান্তি
গ্রামের সাধারণ মানুষের অভিযোগ, হাসপাতালে গিয়ে প্রায়ই চিকিৎসক পাওয়া যায় না। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। জটিল রোগী হলে জেলা শহরে যেতে হয়, এতে সময় ও অর্থ, দুই-ই নষ্ট হয়। দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। যা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে দাবি করে বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ অ্যান্ড হোপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চোধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আগের কোনো সরকারই গ্রামে চিকিৎসকদের থাকার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে যায়নি। ফলে জেলা পর্যায়ে কিছু ভালো চিকিৎসক থাকলেও উপজেলা পর্যায়ে একেবারেই বেহাল দশা। আবার ঢাকায়ও বেশ কিছু স্থাপনা যেমন- সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল (লালকুঠি) হাসপাতালের মতো বড় স্থাপনায়ও চিকিৎসক নেই। ফলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পেতে বাধ্য হয়ে ঢাকা মেডিকেলের মতো বড় হাসপাতালগুলোতে ভিড় করছেন। সেখানে সুযোগ না পেলে বেসরকারি হাসপাতালে যান জমি-জমা সব বিক্রি করে, একটু সুস্থ হওয়ার আশায়। তাই চিকিৎসাকে কীভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে একটি সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। না হলে লাখে লাখে নিয়োগ উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর মতোই বিষয় হবে।
গ্রামে থাকছেন না চিকিৎসকেরা
স্বাস্থ্য প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকদের গ্রামে না থাকার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে, মানসম্মত আবাসনের অভাব, সন্তানের শিক্ষা ও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার সংকট, নিরাপত্তা ও সামাজিক অবকাঠামোর দুর্বলতা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও সহায়ক জনবল না থাকা, পদোন্নতি ও বদলিনীতিতে অসন্তোষ, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহির ঘাটতি। এসব গুরুতর সমস্যার সমাধান না করে হুট করে নিয়োগ দিয়ে পদায়ন করলেই কোনো সুফল আসবে না বলে মত খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, একটা দীর্ঘ সময় ফ্যাসিবাদী সরকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে লুটেপুটে খেয়েছে। আমরা এর থেকে বেরিয়ে এসে স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। এর অন্যতম পদক্ষেপ জনবল নিয়োগ। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করার কাজও খুব শিগগিরই শুরু হবে। কীভাবে চিকিৎসকেরা গ্রামে থাকবেন, সে ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করব- অর্থাৎ স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিত হবে। গ্রামীণ কর্মপরিবেশ উন্নয়ন, আবাসন, নিরাপত্তা, প্রণোদনা এবং কঠোর উপস্থিতি তদারকি একসঙ্গে নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ বদলিনীতিও কার্যকর করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করেন। তাই গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী না হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। চিকিৎসকদের কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, জবাবদিহি এবং রোগীবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। অন্যথায় গ্রামের মানুষকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবার জন্যও শহরমুখী হতে হবে, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এই খাতে লোক নিয়োগের পরিকল্পনা একেবারেই ব্যর্থ হবে বলেও মত তাদের।

