২০২৪ সালের জুলাই। উত্তপ্ত রাজপথ, অস্থির জনপদ আর টানটান রাজনৈতিক উত্তেজনায় থমকে গিয়েছিল গোটা বাংলাদেশ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন কীভাবে মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হলো, তা এখন সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।
দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা একটি শক্তিশালী সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেই আন্দোলনের যাত্রা। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে, কোথায় ছিল সেই মোড়, যে মোড় পেরিয়ে একটি সীমিত দাবির আন্দোলন পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে?
রূপালী বাংলাদেশের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন তিনটি টার্নিং পয়েন্ট, যেগুলো আন্দোলনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়। এর মধ্যে আন্দোলনকারীদের রাজাকারের নাতিপুতি আখ্যা দেওয়া, নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ লেলিয়ে দেওয়া এবং রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। অহিংস আন্দোলন রূপ নেয় এক দফায়। ধূলিসাৎ হয় হাসিনা সাম্রাজ্যের।
বিশ্লেষকদের মতে, অহংকার, রাজনৈতিক দম্ভ এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রাণঘাতী প্রয়োগের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত গণবিস্ফোরণের জন্ম দেয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামিমা সুলতানা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই আন্দোলনে মানুষের হৃদয়ে জমানো পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। অতীতে প্রতিটি আন্দোলনেই শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের গায়ের জোরে এবং দম্ভ দেখিয়ে জিতে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও শেখ হাসিনা অনেকটা গায়ের জোরেই দমিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন গায়ের জোরে, কথার জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকবেন যুগের পর যুগ। চব্বিশের জুলাইয়ের কোটাবিরোধী আন্দোলনে বেফাঁস মন্তব্য, নিরীহ ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগ লেলিয়ে দেওয়া এবং আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা জনমনে দীর্ঘদিন জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায়। মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। স্লোগান ওঠে- ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ তিনি বলেন, জনবিস্ফোরণের কারণেই শেখ হাসিনা ও তার দলীয় নেতাকর্মীরা পালাতে বাধ্য হন।
চীন সফর শেষে দেশে এসে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সময় কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছিল মূলত শান্তিপূর্ণভাবে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার। আন্দোলন তখনো রাজনৈতিক রূপ নেয়নি। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই একটি বাক্যই আন্দোলনের মনস্তত্ত্ব বদলে দেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ অপমানিত বোধ করেন। ওইদিন রাত থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব ক্যাম্পাসে ধ্বনিত হতে থাকে নতুন স্লোগান, ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার!’
বিশ্লেষকদের মতে, এটাই ছিল প্রথম বিস্ফোরণ। কোটা প্রশ্নটি তখন আর শুধু চাকরির সুযোগ-সুবিধার বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেটি পরিণত হয় আত্মমর্যাদা ও নাগরিক পরিচয়ের প্রশ্নে। দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট হলো ওবায়দুল কাদেরের দম্ভোক্তি ও ছাত্রলীগের হামলা।
শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পরদিন ১৫ জুলাই, আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি ঘোষণা দেন, ‘১৯৭১ সালের পরাজিত অপশক্তির কোনো আস্ফালন মেনে নেওয়া হবে না। আন্দোলন মোকাবিলায় ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ছিল পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতমুখী করে তোলার মোড় ঘোরানো ঘটনা। এর অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। রড, লাঠি, হকিস্টিকসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। নারী শিক্ষার্থীরাও হামলা থেকে রেহাই পাননি। হামলার ভিডিও এবং ছবি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখান থেকেই আন্দোলন শিক্ষার্থীদের গণ্ডি অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করে। কারণ সাধারণ মানুষ তখন বিষয়টিকে কেবল কোটা আন্দোলন হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
তৃতীয় টার্নিং পয়েন্ট হলো- আবু সাঈদের বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। দুপুরের উত্তপ্ত পরিবেশে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সংঘর্ষের একপর্যায়ে অন্যরা সরে গেলেও তিনি একা দাঁড়িয়ে থাকেন সড়কের মাঝখানে। দুই হাত প্রসারিত। হাতে একটি সাধারণ লাঠি। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, সে সময় পুলিশের অবস্থান ছিল তার মাত্র ১৪ দশমিক ২ মিটার দূরে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখান থেকেই তাকে লক্ষ করে শটগান থেকে লিড বার্ডশট নিক্ষেপ করা হয়। প্রথম গুলিতে আহত হওয়ার পরও তিনি দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেন। এরপর আরও কয়েক দফা গুলিতে তার বুক, মুখ ও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
একটি ভিডিও, যা বদলে দিয়েছিল আন্দোলনের ইতিহাস। আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার ভিডিওটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয় সেই দৃশ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই ভিডিও আর শুধু একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ভিডিও ছিল না। এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় শক্তির সামনে নিরস্ত্র প্রতিবাদের প্রতীক। আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত পাল্টে যায়। কোটা সংস্কারের দাবি পেছনে চলে যায়। সামনে আসে সরকার পতনের এক দফা দাবি। ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা থেকে উপজেলা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাধারণ মানুষ, সর্বত্র আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যা একটি জাতির চেতনাকে নাড়িয়ে দেয়। আবু সাঈদের শেষ মুহূর্তের ভিডিও অনেকের কাছে তেমনই এক প্রতীক হয়ে ওঠে। কোটা আন্দোলন থেকে এক দফা। ১৬ জুলাইয়ের পর আন্দোলনের ভাষা বদলে যায়। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে পেছনে চলে যায়। সামনে আসে সরকার পতনের এক দফা দাবি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের প্রায় সব জেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষক, অভিভাবক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিককর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার তখন আর কেবল শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি ছিল না; তারা মুখোমুখি হয়েছিল বিস্তৃত জনঅসন্তোষের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে জনমতের প্রতি অবজ্ঞা, বিরোধী কণ্ঠকে অপমান এবং বলপ্রয়োগের নীতি শেষ পর্যন্ত শাসকদের জন্যই সবচেয়ে বড় সংকট ডেকে আনে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহগুলো অনেকের কাছে সেই বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ। প্রথমে একটি মন্তব্য। তারপর রাজনৈতিক দম্ভ। সবশেষে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ। এই তিনটি ধারাবাহিক সিদ্ধান্তই আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। পরিস্থিতি ক্রমেই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। টানা আন্দোলন, সংঘর্ষ এবং জনরোষের মধ্যে ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং একটির সঙ্গে আরেকটির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল। এই তিনটি মোড় ঘোরানো ঘটনাই শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিণতির ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে তাই ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাই শুধু তিনটি দিন নয়; অনেকের কাছে এগুলো রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং জনআন্দোলনের গতিপথ বদলে দেওয়া তিনটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

