তীব্র জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকাসহ নানা কারণে গাজীপুরে বেড়েছে লোডশেডিং। শহরাঞ্চলে তুলনামূলক কম হলেও গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা জনজীবনের পাশাপাশি শিল্প খাতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
তীব্র গরমের মধ্যে দিনে ৬ থেকে ৭ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। প্রতিবার অন্তত এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। পানির সংকট, গোসল ও দৈনন্দিন কাজকর্মে ভোগান্তির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প কারখানাগুলো।
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কারখানা বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলেও ডিজেলের সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে সেটিও নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক সময় শ্রমিকদের কাজ না থাকায় বসে থাকতে হচ্ছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে এবং উৎপাদন বন্ধ থাকায় ঈদের আগে বেতন-ভাতা পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে তাদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
স্থানীয় একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাসুম হোসেন জানান, দিনের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, উৎপাদন কমে গেছে। নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট দিতে পারছি না। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের দামেই পণ্য কিনতে চাইছেন, কিন্তু উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে তাদের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হলেও সংকট কমেনি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ সংকট দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এলাকায় মোট চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭২ মেগাওয়াটে। একইভাবে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এলাকায় ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন শ্রীপুর ও মাওনা অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। এতে গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শিল্পাঞ্চলনির্ভর গাজীপুরে কারখানা মালিক ও শ্রমিক উভয়েই পড়েছেন চরম সংকটে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, বিকল্প শক্তির উৎস ব্যবহারে জোর দেওয়া এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এ সংকট আরও গভীর হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন