যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত। তার কঠোর সিদ্ধান্তে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে ক্যাশ কাউন্টারের রসিদ ছাড়া নগদ টাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বেচ্ছাসেবীদের ট্রলি-হুইলচেয়ার বাণিজ্য। এ ছাড়া ১৫ বছর পর নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে রোগীদের খাদ্যের মান উন্নয়ন, বিনামূল্যের ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে এর সুফল পাচ্ছে রোগীরা।
জানা গেছে, যশোরসহ নড়াইল, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার বহু মানুষ সরকারি এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসেন। এখানে রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে স্বেচ্ছাসেবীদের ট্রলি ও হুইলচেয়ার বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। হাসপাতাল থেকে দেওয়া আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রোগী সেবার নামে তারা বেপরোয়া বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন। রোগী ওঠানো-নামানোর কাজে ব্যবহৃত ট্রলি ও হুইলচেয়ার নিজেদের কবজায় রেখে দিতেন। রোগীর স্বজনরা চাইলেও দেওয়া হতো না। রোগী ওঠানো-নামানোর জন্য প্রতিবার স্বেচ্ছাসেবীরা ২০০ টাকা আদায় করতেন। এতে হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছিল। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের অর্থবাণিজ্য বন্ধে গত ৫ মার্চ লিখিত আদেশ দেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত। এতে স্বেচ্ছাসেবীরা ক্ষুব্ধ অর্থবাণিজ্য চালুর দাবিতে ৭ মার্চ তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভও করেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়কের কঠোরতায় তারা ফায়দা হাসিলে ব্যর্থ হন। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবীদের সকল ধরনের অর্থবাণিজ্য বন্ধ। এর আগে অনেক কর্মকর্তা চেষ্টা চালিয়েও তাদের বাণিজ্য বন্ধ করতে সফল হননি। ডা. হুসাইন শাফায়াত প্রথমবার স্বেচ্ছাসেবীদের অর্থবাণিজ্য বন্ধ করতে সফল হলেন।
সূত্র জানায়, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াতের আন্তরিক প্রচেষ্টায় হাসপাতালের এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, প্যাথলজি, সিটিস্ক্যান, ইকো, আইসিইউ ইসিজি, পেইং বেড, কেবিন, জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, করোনারি কেবিন, করোনারি ইসিজি বিভাগে আর্থিক অনিয়ম কমেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার টাকা ক্যাশ কাউন্টারের মাধ্যমে জমা দেওয়ার কারণে প্রতি বছর রাজস্ব বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন খাত থেকে আয় হয় ৪ কোটি টাকার বেশি। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের পর্যন্ত রাজস্ব আয় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৮৯০ টাকা ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ লাখ ১৯ হাজার ৯১০ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
সরকারিভাবে এই হাসপাতালে মোট ১১২ প্রকারের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ইডিসিএল থেকে আসে ৮২ প্রকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় অর্থে টেন্ডারের মাধ্যমে অবশিষ্ট ৩০ প্রকার ওষুধ কেনা হয়। কিন্তু রোগীরা বিনামূল্যের ওষুধ ঠিকমতো পাচ্ছিলেন না বলে অভিযোগ ছিল। বিষয়টি আমলে নেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত। এরপর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ সামগ্রী নিশ্চিত করতে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগে দায়িত্বরত ইনচার্জদের নির্দেশ দেন। তার কঠোর হস্তক্ষেপে রোগীরা বিনা মূল্যে শতভাগ ওষুধ পাচ্ছে।
গত ২০১০-১১ অর্থবছরের পর থেকে হাসপাতালে খাদ্য সরবরাহের টেন্ডার হয়নি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আহ্বান করা টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৬ জুন উচ্চ আদালতে মামলা করেছিলেন তৎকালীন ঠিকাদার হাফিজুর রহমান শিলু। ফলে আদালতের নির্দেশে খাবারের টেন্ডার বন্ধ ছিল। সেই থেকে একজন ঠিকাদার রোগীদের জন্য খাবার সরবরাহ করে আসছিলেন। ১২৫ টাকা রেটে খাবার সরবরাহ করায় উন্নত খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন রোগীরা। ফলে মামলা নিষ্পত্তি করতে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত। পরে ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর উচ্চ আদালত থেকে খাবারের টেন্ডার দেওয়ার জন্য অনুমোদন মেলে। ১ ডিসেম্বর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে খাবারের টেন্ডার প্রকাশ করা হয়। টেন্ডার পান মেসার্স আসলাম এন্টারপ্রাইজ। নতুন ঠিকাদার ১ মার্চ থেকে রোগীদের খাবার সরবরাহ শুরু করেছেন। বর্তমানে প্রতি রোগী ১৭৫ টাকার খাবার পাচ্ছেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, ২০২৫ সালের ১১ মার্চ তিনি যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে যোগ দেন। যোগদানের পর থেকেই আর্থিক দুর্নীতি বন্ধে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। এখন প্রতি মাসে রাজস্ব বাড়ছে। দুর্নীতি নেই বললেই চলে। স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করার সুযোগে যথেচ্ছা বাণিজ্য করছিলেন। তাদের আচরণে রোগী ও স্বজনরা অতিষ্ঠ ছিল। শৃঙ্খলা ফেরাতে স্বেচ্ছাসেবীদের বাণিজ্য বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রোগীদের ন্যায্য পাওনা কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। সরকারের বিনা মূল্যের ওষুধ তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন ঠিকাদার উন্নত মানের খাবার বুঝিয়ে দেবেন বলে আশাবাদী।

