ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

এবার যশোর আদ-দ্বীনে রোগীর মৃত্যু ঘিরে বিক্ষোভ

যশোর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৬, ১০:১১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

যশোরের পুলেরহাটে অবস্থিত আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলায় ইমরান (৩৫) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দিবাগত রাতে হাসপাতালটিতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং নিহতের স্বজনসহ স্থানীয়রা দফায় দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

নিহত ইমরান যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া গাজীপাড়ার শওকত আলী বিশ্বাসের ছেলে।

নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগে জানা যায়, তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ইমরানকে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ভর্তি করে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে পাঠান।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাহাত ও মেডিকেল অফিসার ডা. মুন্নি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীকে একের পর এক ইনজেকশন দেন।

নিহতের খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন অভিযোগ করেন, প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান তীব্র অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের জানানো হলেও তারা তা গুরুত্ব দেননি।

তিনি আরও জানান, পরবর্তী ইনজেকশন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইমরানের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। পরে তাকে দ্রুত হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-এ স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, ভুল ইনজেকশন ও চিকিৎসা অবহেলায় ইমরানের মৃত্যু হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা দায়ী চিকিৎসকদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেন।

খবর পেয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের দাবি, এ হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু এবং সিজারিয়ান অপারেশন, অস্ত্রোপচার ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। তারা জানান, এর আগে স্বাস্থ্য বিভাগে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ঘটনার পর নিহতের বাবা শওকত আলী বিশ্বাস বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (সাধারণ ডায়েরি) দায়ের করেছেন।

তবে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আদ্-দ্বীন সখিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদ হোসেন। তিনি দাবি করেন, রোগীকে নিয়ম মেনেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।

তিনি বলেন, রোগীকে গ্যাসের ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন ও স্যালাইন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে জীবন রক্ষাকারী শেষ ইনজেকশন ‘হাইসোমাইড’ প্রয়োগ করা হয়। এর বাইরে অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। রোগী জ্বরের ইতিহাস নিয়ে ভর্তি হলেও অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা গেছেন।

মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে তিনি প্রাথমিকভাবে হৃদরোগজনিত কারণে মৃত্যুর কথা বলেন।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, “রাতে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি। রোববার অফিস খোলার পর তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, রাতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।