জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নের কাদোয়া বিষ্ণপুর গ্রামে একটি গভীর নলকূপের অংশীদারদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে টানা দুই মাস ধরে সেচ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে অন্তত ১০০ বিঘা জমিতে আলু, রবিশস্য, বোরো ধানের বীজতলা ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ওই এলাকার শতাধিক প্রান্তিক কৃষক।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ২০১৪ সালে ১১০ বিঘা জমি নিয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জমির সেচ সুবিধার জন্য ওই গ্রামে গভীর নলকূপটি স্থাপন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপটি গ্রামের কৃষকদের প্রধান সেচের উৎস ছিল। গত দুই মাস আগে হঠাৎ করে নলকূপটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ে। বিষয়টি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা যাচাই করে ওই স্থানে নতুন করে বোরিং করার পরামর্শ দেন।
এই সুযোগে নলকূপের জমির মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে নতুন রোরিং করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প। বিরোধের জের ধরে আবুল খায়ের নামের আরেক অংশীদার স্কিমের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে নতুন বোরিং স্থগিত চেয়ে আদালতে মামলা করেন। এতে বন্ধ হয়ে যায় নতুন বোরিং কার্যক্রম।
এ ঘটনায় দুই মাস জমিতে প্রয়োজনীয় পানি সেচ না পাওয়ায় অনেক জমিতে ফসল শুকিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার বীজতলাই নষ্ট হয়ে গেছে।
আবু হাসান নামের একজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বলেন, গভীর নলকূপ নষ্ট হওয়ার পর অংশীদারদের দ্বন্দ্বে দুই মাস ধরে সেচ বন্ধ। ফসল বাঁচাতে শ্যালো মেশিন দিয়ে দূরের পুকুর থেকে পানি আনতে হচ্ছে। যেখানে নলকূপের পানি বিঘাপ্রতি ২০০ টাকা, সেখানে এখন ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তাও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমার আলু, রবিশস্য ও বোরো ধানের বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
আব্দুল আজিজ নামের আরেক কৃষক জানান, এই মৌসুমে রসুন, পেঁয়াজ, আলু ও গম চাষ করেছিলাম। গভীর নলকূপ হঠাৎ বন্ধ হওয়ার পর মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে বিগত দুই মাস ফসলে সেচ বন্ধ রয়েছে। এতে আমার প্রায় সব ফসল নষ্ট হয়েছে। অনেকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারলেও আমার জমি উঁচু আর দুরে হওয়ায় কোনোভাবেই সেচ দিতে পারিনি। সেচের অভাবে আমার ফসল নষ্ট হয়েছে।
গভীর নলকূপ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও অপরেটর আবু সাঈদ বলেন, ‘দুই মাস আগে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হঠাৎ করে গভীর নলকূপটি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা এখানেই নতুন বোরিং করতে বলেন। সেই মোতাবেক আমরা দ্রুত নতুন বোরিং করার জন্য টাকা জমা দিয়ে সকল প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ইতোমধ্যে আরেক অংশীদার আবুল খায়ের অনিয়মের অভিযোগ তুলে নতুন করে বোরিং করতে বাধা দেন। পরে তিনি বোরিং বন্ধ করতে আদালতে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ কারণে দুই মাস থেকে জমিগুলোতে আমরা সেচ দিতে পারিনি। কৃষকদের বাঁচাতে আমরা যেভাবেই হোক নতুন বোরিং করে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করব।’
অন্যদিকে অংশীদার আবুল খায়ের অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি সেচ বন্ধের পক্ষে নই। দীর্ঘদিন ধরে নলকূপ পরিচালনায় অনিয়ম হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কৃষকদের পানি দেওয়া হতো, যার সঠিক হিসাব কখনোই দেওয়া হয়নি। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় আমি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি।’
আক্কেলপুর বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা মনসুর আলী বলেন, ‘নলকূপের ঘরের জমি নিয়ে মূলত দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আমরা অংশীদারদের বসে সমস্যার সমাধান করতে বলেছি। এ ছাড়া আগের বোরিংয়ে প্রচুর পাথর থাকায় সেখানে কাজ করা যাচ্ছিল না। কৃষকদের ফসলের কথা বিবেচনা করে পাশের জমিতে নতুন করে বোরিং শুরু করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন