ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী গণসংযোগের অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জনসভা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
এ সময় তিনি বলেন, 'নদীগুলো খুন করা হয়েছে। হাওর-বিল ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা এগুলোতে হাত দেব। নদীর জীবন ফিরে আসলে বাংলাদেশের জীবন ফিরে আসবে। কাজেই নদী দিয়েই আমাদের উন্নয়নের সংস্কার শুরু হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'কিশোরগঞ্জ জেলার মানুষ স্বভাবগতভাবেই ধর্মপ্রাণ। কিন্তু তারা অন্যান্য ধর্মের সাথেও চমৎকার সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। এটিই ধর্মের সৌন্দর্য। আমরা দেশটাকে সব ধর্ম দিয়ে ফুলের বাগানের মতো সাজাব। আমরা আমাদের প্রিয় জাতিকে টুকরা টুকরা করতে আর কাউকে সুযোগ দেব না। অতীতের কাসুন্দি শেষ। ওগুলো শুনিয়ে শুনিয়ে জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে জনগণের কপাল-কিসমত যারা হাইজ্যাক, লুটপাট করেছে, তাদের জায়গা বাংলাদেশে আর হবে না। চব্বিশের যুবসমাজ অতীতের পচা রাজনীতির জন্য শুধু বুক চিতিয়ে লড়াই করে নাই। তারা পরিবর্তন চেয়েছে। ১৩ তারিখ থেকে বাংলাদেশে সে পরিবর্তনের সূচনা হবে ইনশা আল্লাহ।’
জামায়াতের আমির এ সময় আরও বলেন, ‘মায়েদের ঋণ পরিশোধ করা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? কিন্তু আমাদের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করতে হবে। ১৫ জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কলিজার টুকরো মেয়েদের গায়ে উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসীরা হাত দিয়েছিল, সেদিনই বাংলাদেশে আগুন জ্বলে উঠেছিল। মানুষ সবকিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু তার মায়ের অপমান সহ্য করতে পারে না। সমানভাবে তরুণদের সাথে তরুণীরা, যুবকের সাথে যুবতীরা, ভাইয়ের সাথে বোনেরা, বাবার সাথে মায়েরা চব্বিশে যুদ্ধ করেছে। আমরা মায়েদের কথা দিচ্ছি, আপনাদের সমাজের সকল দিক থেকে সম্মানিত করব। তারই অংশ হিসেবেই আমরা মাথায় তুলব। এটা আমাদের দায়িত্ব। যে জাতি মাকে সম্মান করে, আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্মান বৃদ্ধি করে দেয়। আর যে জাতি মায়ের সম্মান রাখতে পারে না, আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মান উঠিয়ে নেয়।’
জামায়াতে ইসলামীর আমির আরও বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি মানুষ শান্তিতে নিরাপদে থাকবে। কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাবে। একজন শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা পাবে শ্রমের। এবং সে মানবিক মর্যাদায় সেখানে কাজ করবে। এই দেশে হাত পাতা মানুষ থাকবে না। হাত মজবুত হয়ে কাজ করার মানুষ থাকবে। এরপরে যাদের হাত কাজ করতে পারবে না, তাদের দায়িত্ব সরকার নেবে। একটা সুস্থ সবল জাতি গঠনের জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুদের সমস্ত চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে সরকার। আমরা বলেছি একটা শিশুও আর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে না।’
সকাল থেকেই কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ঢল নামে। জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
মঙ্গলবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে শুরু হয় জামায়াতের এই নির্বাচনি জনসভা। জামায়াত আমিরের আগমনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছিল। ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে যায় পুরো উপজেলা শহর।
সকাল পৌনে ১১টায় প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত হন ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াতে ইসলামী কেবল নিজেদের দলের নয়, বরং দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চায়। আসন্ন নির্বাচনে কোনো ধরনের 'চোরাগোপ্তা' পথে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি প্রদান করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন। এ ছাড়া নদী ও হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেন আমিরে জামায়াত। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ যাকেই নির্বাচিত করুক, তারা তা মেনে নেবেন, তবে অন্যায্য কোনো নির্বাচন বরদাশত করা হবে না।
বক্তব্য শেষে কিশোরগঞ্জ-২, কিশোরগঞ্জ-৩, কিশোরগঞ্জ-৪ ও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ড. শফিকুর রহমান। এ সময় কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীর হাতে ও রিকশা প্রতীক তুলে দেন তিনি।
কটিয়াদীরের এই জনসভায় জেলা ও উপজেলার শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াত আমির অধ্যাপক রমজান আলী। বিএনপির সাবেক এমপি ও বহিষ্কৃত নেতা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জনকেও সামনের সারিতে দেখা যায়। কটিয়াদীতে সভা শেষ করে এ দিনই ময়মনসিংহ ও গাজীপুর সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে তার।

