কুষ্টিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যাচ্ছে গাছিদের। শীতের শুরু থেকেই বেড়েছে রসের চাহিদা। পাশাপাশি রস জ্বালিয়ে তৈরি করা গুড়ের চাহিদাও অনেক। জেলার বাইরের গাছিরাও এসে কুষ্টিয়ায় রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করছেন। সুস্বাদু এই খেজুরের রস আগুনে জ্বালিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড়। গাছিদের এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। খেজুরের রস বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এখানকার গাছিরা।
আবহমান গ্রামবাংলায় শীতের সকালে সূর্য মিটমিট করে আলো ছড়ানোর আগেই আমরা বেরিয়ে পড়ি রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরির দৃশ্য দেখতে। খেজুরের রস আহরণ শেষে হাঁড়িতে সংগৃহীত রস নিয়ে বড় চুলার কাছে ছুটে আসেন গাছিরা। এরপর টিনের বড় পাত্রে রস ঢেলে জ্বাল দিয়ে শুরু হয় গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। আস্তে আস্তে এসব রস শুকিয়ে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে জ্বালানোর ফলে তৈরি হয় লাল গুড়।
গাছিরা জানায়, প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যেই খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিষ্কার করে ছোট-বড় মাটির কলস বেঁধে রাখা হয় রসের জন্য। এরপর ভোর থেকেই ওই সব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। সকালের দিকে কেউ-বা রস কিনে নিয়ে যায়। আবার এই রস দিয়ে পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করে বিক্রি করে থাকে। তবে ভেজালের ভিড়ে আসল খেজুরের গুড় পাওয়া যেন দায়।
জানা গেছে, কুষ্টিয়ার সদর, দৌলতপুর এবং মিরপুর উপজেলার গ্রামগুলোতে খেজুর গাছের সংখ্যা বেশি। এসব খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ ও গুড় তৈরি করে লাভবান হচ্ছেন গাছিরা। আবার বাড়তি লাভের আশায় এসব এলাকায় আসছেন অন্য জেলার গাছিরাও। খেজুর গুড় তৈরির পেশায় এখন বাড়তি আয়ে খুশি তারা।
কুষ্টিয়া শহর বাইপাস সড়কের মেঠোপথের ধারে প্রায় ২০০ খেজুর গাছ লিজ নিয়েছেন রাজশাহীর বাঘা থেকে আসা একদল গাছি। স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে সোয়া লাখ টাকায় শীতের ৪ মাসের জন্য খেজুর গাছগুলো লিজ নেওয়া হয়েছে। এসব গাছ থেকে ৪ জন মিলে প্রতিদিন রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন। এ ছাড়া খেজুরের রসও বিক্রি করা হয়।
এরা বলেন, ‘প্রায় বিশ বছর ধরে এভাবে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করি। এরপর এসব রস দিয়ে পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করি।’
রাজশাহীর বাঘা থেকে থেকে আসা দুলাল জানান, ‘এ বছর কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ এলাকায় আড়াই শ গাছ লিজ নিয়ে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে থাকি। উৎপাদিত এই গুড় বিক্রিতে কোনো ঝামেলা নেই। সকালের দিকে ক্রেতারা এসে নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যায়।’
নাটোরর সিংড়া থেকে আসা আলাউদ্দিন নামে আরেক গাছি জানান, শীত মৌসুমের শুরু থেকেই খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করা হয়। শীতের প্রায় চার মাস এ রস সংগ্রহ করা যায়। এই রস থেকে বিভিন্ন রকমের পাটালি ও লালি গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে আমরা সংসার চালাই। তিনি আরও বলেন, শীতের পিঠা ও পায়েসের জন্য খেজুরের রস ও গুড়ের বাড়তি চাহিদা রয়েছে।
স্থানীয় খেজুর রস ক্রেতা শিমুল জানান, শীতের সকালে গাছ থেকে নামানো কাঁচা রসের স্বাদ বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এ ছাড়াও জ্বাল দেওয়া রসের তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার অতুলনীয়।’ এখান থেকে রস কিনে বোতলে করে বাড়ির জন্য নিয়ে যাচ্ছি বলেও জানান তিনি।
আক্তার হোসেন নামে এক গুড় ক্রেতা জানান, ‘খাঁটি গুড় পাওয়ার আশায় এখানে আসলাম। রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করে কিনে নিলাম। আসলে বর্তমানে ভেজালের কারণে খাঁটি জিনিসের প্রাপ্যতা একটু মুশকিল হয়ে গেছে। তাই এখানে এসে গুড় কিনতে পেরে ভালো লাগছে।’
ব্যবসায়ী সাইদুল বারী টুটুল বলেন, শীত এলেই কুষ্টিয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলে শুরু হয় খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি। আর এই গুড়কে দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দিতে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন একজন তরুণ উদ্যোক্তা—এস এম জামাল। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, তিনি কৃষকের বন্ধু, যিনি গ্রামীণ পণ্যের সঠিক বাজার তৈরি করে দিচ্ছেন। ভেজালের ভিড়ে খাঁটি খেজুরের গুড় নিশ্চিত করতে অনলাইনে বিজনেস পরিচালনা করেন কৃষকের বন্ধু এস এম জামাল। তিনি বলেন, এই পেজ এবং নিজ প্রোফাইলে গুড় তৈরির কার্যক্রম লাইভ ও ভিডিও চিত্রে দেখানো হয়। সেই গুড়ের অর্ডার করেন, চাহিদা মোতাবেক গুড় সরবরাহ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাকে যারা চেনেন ও জানেন তারাই মূলত বেশি অর্ডার করেন। আমি চাই খাঁটি খেজুরের গুড় শহরের প্রতিটি ঘরে পৌঁছাক, আর গাছিরা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য দাম পাক। কৃষকদের সঙ্গে কাজ করাই আমার গর্ব।’

