ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দুই বছর অনুপস্থিত, তবুও অধ্যক্ষ পদের বেতন পাচ্ছেন আ.লীগ নেতা

কালীগঞ্জ (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা শরওয়ার আলম। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও অধ্যক্ষ পদে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক শরওয়ার আলম। তিনি আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ।

অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে জালিয়াতির মাধ্যমে তিন বিষয়ে তৃতীয় বিভাগ নিয়েও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে গত ১৯৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর নিয়োগ পান আওয়ামী লীগ নেতা শরওয়ার আলম। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শহিদুর রহমান অবসর গ্রহণ করলে দলীয় প্রভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন তিনি।

এরপর ক্ষমতার দাপটে পূর্বপদে ইস্তফা না দিয়ে ১২ বছরের স্থানে মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন এই দাপুটে নেতা। শিক্ষক-অভিভাবকসহ স্থানীয়রা তার জাল-জালিয়াতির প্রমাণসহ অভিযোগ করেও তাকে টলাতে পারেননি। সবকিছুই দলীয় প্রভাবে হজম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নামে লাখ লাখ টাকার সরকারি বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বন্ধ করেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত তিনি। এভাবে টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি এই অধ্যক্ষ। বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

গত ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ এনে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় অভিভাবকরা। অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন ইউএনও নুর-ই-আলম সিদ্দিকী তাকে খোরাকি দিয়ে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করেন।

এই আদেশ স্বাভাবিকভাবে তিন মাস পর বাতিল হলে তিনি পুনরায় পূর্ণ বেতন পেতে শুরু করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, বেতনের একটি বড় অংশ কর্তৃপক্ষকে উৎকোচ দিয়ে তিনি অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা নিচ্ছেন।

তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন। এদিকে প্রতিষ্ঠানের সমাজকর্ম বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা জামান—যিনি সাত বছর অনুপস্থিত এবং চার বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি (বর্তমানে গ্রেপ্তার)—তাকেও বেতন-ভাতা প্রদান, প্রতিষ্ঠানের ইট-খোয়া নিজের বাড়িতে নেওয়া, ফ্যান চুরির মামলা আপসের নামে চোরের কাছ থেকে অর্ধলাখ টাকা আত্মসাৎ এবং অনিয়মিত উপস্থিতিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।

অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতাসহ সব সুবিধা ভোগ করায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ অনেক শিক্ষক-কর্মচারী অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়ছে। পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা।

শিক্ষার্থী মাজেদুল বলেন, অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম জুলাই আন্দোলনের পর থেকে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। পুকুরপাড় নির্মাণের নামে ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছেন। তিনি না এসেও বেতন পাওয়ায় অন্য শিক্ষকরাও অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। এখন দু-একটি ক্লাস ছাড়া ক্লাসই হয় না।

অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ না এসে বেতন পাচ্ছেন, আর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পেয়ে কেউ প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত ভবনের বারান্দার ইট-খোয়া বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। চুরির মামলা আপসের নামে টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। সবাই আত্মসাতে ব্যস্ত, পড়াশোনার দিকে কারও নজর নেই। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যালয় শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) তমিজার রহমান বলেন, অধ্যক্ষ স্যার জুলাই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই অনুপস্থিত। অন্য প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা থাকলেও এখানে এমন কিছু ঘটেনি। তবে শুনেছি, তদন্তে তার নিয়োগে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় লজ্জা ও ভয়ে তিনি আসছেন না। তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আমরা জানি না তিনি জীবিত না মৃত।

কলেজ শাখার সহকারী অধ্যাপক এটিএম আতাউর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দাপটে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রভাষক এবং পরে ইস্তফা না দিয়ে মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় অধ্যক্ষ পদে আসীন হন শরওয়ার আলম। টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও রহস্যজনকভাবে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন তিনি। তাকে দেখে অন্যরাও অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শুনেছি, পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের চেষ্টা করছেন।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ইউএনও স্যার প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে নির্দেশ দিয়েছেন, তাই অনুপস্থিত অধ্যক্ষ শরওয়ার আলমকে বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। তিনি না এসে বেতন পাবেন, আর আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করব কেন? সরকার যখন তাকে বেতন দিচ্ছে, তখন তাকে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনলেই হয়। আমারও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা নেই। আমি আমার নিজ পদে ক্লাস নিয়েই থাকতে চাই। তবে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতন-ভাতার সিট প্রস্তুত করে দেন, আমি শুধু অনুমোদন করি। এতে কোনো ধরনের লেনদেনের সুযোগ নেই। তিনি যদি দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছুক হন, তবে লিখিতভাবে জানালে আমরা অন্য কাউকে দায়িত্ব দেব। পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের জন্য একটি আবেদন করেছেন। আমরা তা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেব।