ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

‘দীপুকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে এমন নির্মম মৃত্যু হতো না’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ০৬:৫৬ পিএম
দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিহত দীপু চন্দ্র দাসকে যদি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পুলিশের হাতে তুলে দিত তাহলে হয়তো এমন নির্মম মৃত্যু হতো না বলে মন্তব্য করেছেন ময়মনসিংহ জেলা হিন্দু মহাজোটের সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা নৃপেষ রঞ্জন সরকার।

রোববার (২১ ডিসেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ নগরীর শহীদ ফিরোজ-জাহাঙ্গীর চত্বরে সচেতন সনাতনী সমাজের ব্যানারে আয়োজিত এক মানববন্ধনে তিনি এই অভিযোগ করেন।

হিন্দু মহাজোটের সভাপতি বলেন, ‘আমরা জেনেছি ঘটনার সময় পুলিশ প্রস্তুত ছিল। তখন যদি দীপু চন্দ্র দাসকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পুলিশের হাতে তুলে দিত, তাহলে হয়তো এমন নির্মম মৃত্যু হতো না। কিন্তু পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কারখানা কর্তৃপক্ষ দীপুকে পুলিশের হাতে না দিয়ে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দিয়েছে। আমরা এ ঘটনায় কোম্পানির মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের কঠোর বিচার দাবি করছি।’

প্রায় এক ঘণ্টা অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক ডা. এনসি পাল, তারাকান্দা উপজেলা শাখার সভাপতি লিমন দেবনাথ, লিমন পাল, সঞ্জয় দত্ত, শঙ্কর সাহা প্রমুখ।

মানববন্ধনে নিহত দীপু চন্দ্র দাসের প্রতিবেশি লিমন দেবনাথ বলেন, ‘দীপু ঋষি জাতের মানুষ ছিল। সে আমার প্রতিবেশি এবং অনেক ভালো ছেলে ছিল। তার পরিবারে শিক্ষিত কেউ নেই, একমাত্র বিএ পাশ ছেলে ছিল দীপু। গত দুই বছর আগে সে বিয়ে করেছে এবং এক বছরের একটি সন্তান রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তি জীবনে সে সচেতন ছিল, কখনো ধর্ম অবমাননা করতে পারেনি। কিন্তু ধর্ম অবমাননার ট্যাগ দিয়ে তাকে বিভৎসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, যেন কেউ এ ধরনের জঘন্য কাজ করার সাহস না পায়।’

নারায়ণ পাল নামের অপর এক নেতা বলেন, ‘দীপু চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার কী দোষ ছিল তা এখনো আমরা জানি না। এই ঘটনায় দায়ী কারা? সরকার না প্রশাসন? আমরা দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

জেলা হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক ডা. এনসি পাল বলেন, ‘কোনো সুস্থ মানুষ এই হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড দেখে স্থির থাকতে পারবে না। একটি মানুষকে হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ আমরা মানতে পারছি না। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের ফাঁসি চাই।’

মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। তারা ব্যানার ও ফেস্টুনে দীপু চন্দ্র দাস হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এবং নিহতের পরিবারকে এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কারখানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে এবং মরদেহে আগুন ধরিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯ ডিসেম্বর নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে ভালুকা থানায় মামলা দায়ের করেন। ইতোমধ্যে ১২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩ জনের বিরুদ্ধে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

এদিকে, ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘অপরাধ করলেও আইন নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। কেন ওই যুবককে পুলিশের হাতে না দিয়ে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকিদের গ্রেপ্তার অভিযান চলছে।’

নিহত দীপু চন্দ্র দাস (২৮) জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। দুই বছর ধরে তিনি ওই কোম্পানিতে কাজ করছিলেন।