ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩ শিশু ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১২ দিনে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে মোট ১০৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। ‘হাম’ একটি ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে গঠন করা হয়েছে মেডিকেল টিম এবং চালু করা হয়েছে পৃথক কর্নার।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৪ মার্চ হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতাল প্রশাসন।
হাসপাতালের নতুন ভবনের ৬ তলার ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তিন ইউনিটের তিনটি কক্ষে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ১০ শয্যাবিশিষ্ট কক্ষগুলো ‘হাম কর্নার’ নামে মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। তবে কক্ষগুলোতেও রোগীর চাপ সামলানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক রোগী মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন ভবনের ৬ তলার ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের তিন ইউনিটে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ৬১১ নম্বর কক্ষে ২৫ মাস বয়সী হাম আক্রান্ত শিশু আয়াতের মা ঝর্ণা আক্তার কনার সঙ্গে কথা হয়। তিনি ময়মনসিংহ মহানগরের আকুয়া চুকাইতলা এলাকার বাসিন্দা। তিনি জানান, প্রথমে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, শরীরে লালচে গুটি এবং মুখের ভেতরে সাদা দাগ দেখা দেয়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে তিন দিন ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়। কিন্তু উন্নতি না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে শিশুর অবস্থা কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
একই কক্ষে ৯ মাস বয়সী হাম আক্রান্ত শিশু আবু জরকে নিয়ে ভর্তি আছেন জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার ওমর ফারুক। তিনি জানান, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বমি ও শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে ৯ মার্চ জামালপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসার পরও উন্নতি না হওয়ায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। বর্তমানে হাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নিউমোনিয়া পুরোপুরি সেরে ওঠেনি।
একই ওয়ার্ডের ৬০৬ নম্বর কক্ষে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার মো. পনির হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তিনি জানান, তার ৭ মাস বয়সী সন্তান ছোয়াদ ৩ মার্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চার দিন পর কিছুটা উন্নতি হলে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু পুনরায় অবস্থার অবনতি হলে ২৫ মার্চ আবার ভর্তি করা হয়।
ময়মনসিংহ মহানগরের শানকিপাড়া এলাকার স্বপ্না আক্তার তার ৭ মাস বয়সী সন্তান আদনানকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি জানান, প্রথমে ২১ মার্চ ভর্তি করা হলেও ২৩ মার্চ উন্নতি হওয়ায় ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরে রোববার সকালে অবস্থার অবনতি হলে আবার ভর্তি করা হয়।
কিশোরগঞ্জের ইটনা থেকে জমজ দুই সন্তানকে নিয়ে গত মঙ্গলবার ভর্তি হন আল আমিন ও নাজমা আক্তার দম্পতি। জুঁই ও জুনাইনা নামের দুই শিশুর বয়স ১৪ মাস। ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। নাজমা আক্তার বলেন, ‘টিকা না দিলে এমন হবে জানলে আগেই টিকা দিতাম।’
হাসপাতালের শিশু বিভাগের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে দেখা যায়, ১০ শয্যার কক্ষে প্রায় ১৫–১৬ জন শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। এক বিছানায় দুই রোগীকেও থাকতে হচ্ছে। ধারণক্ষমতার বেশি রোগী থাকায় অন্য রোগীদের সঙ্গেই হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসকরা জানান, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। ভর্তি শিশুদের অনেকের মধ্যেই এসব জটিলতা রয়েছে।
হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন ডা. গোলাম মওলা বলেন, ‘হামের টিকা নেওয়া ও না নেওয়া—দুই ধরনের রোগীই পাওয়া যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাউকে আইসিইউতে পাঠানোর প্রয়োজন হয়নি। আগে মাঝে মাঝে রোগী পাওয়া গেলেও এ মাসে সংখ্যা অনেক বেড়েছে। পৃথক কর্নার করা হলেও জায়গার অভাবে শতভাগ আইসোলেশন সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালে ৬৬ জন হাম আক্রান্ত শিশু চিকিৎসাধীন। মোট ১০৬ জন ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘হাসপাতাল প্রশাসনের নির্দেশনায় সাধারণ রোগী থেকে হাম আক্রান্তদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকায় পুরোপুরি পৃথক রাখা কঠিন হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধিরা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন। হঠাৎ সংক্রমণ বাড়ার কারণ নির্ধারণে কাজ চলছে। টিকাদানে ঘাটতি একটি কারণ হতে পারে।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টিকাদান ঠিকমতো হলে এমন রোগীর চাপ থাকত না।’
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ বলেন, ‘জেলার ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি বহির্বিভাগে শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড ফিভার ক্লিনিক চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন