ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

১০ বছরের বরাদ্দ ‘অদৃশ্য’, রোগী কল্যাণ কমিটি নিয়ে তদন্ত দাবি

বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের রোগী কল্যাণ কমিটির বরাদ্দ ও কমিটি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের জন্য ওষুধ ও অন্যান্য সেবা বরাদ্দ দেওয়া হলেও রোগীরা তা পাচ্ছেন না। বরাদ্দের ব্যয় দেখানো হলেও এলাকাবাসী বলছেন, তারা কোনো চিকিৎসা সহায়তা, ওষুধ বা দাফন-ব্যয়ের সহায়তা পাননি।

সমাজসেবা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে বদলগাছী সমাজসেবা অফিস রোগী কল্যাণ কমিটি ২৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ১৯ আগস্ট ২০১২ সালে বদলগাছী সোনালী ব্যাংক শাখায় একটি হিসাব খোলা হয়।

সেই সময় কমিটিতে উপজেলার রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা ছিলেন। শুরুতে তারা দু-একটি সভায় উপস্থিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেউ আর সভায় উপস্থিত হননি।

তালিকায় থাকা ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মেয়াদ বহু আগে শেষ হয়েছে। তারা উপজেলার কমিটির সভায় আসেন না, কিন্তু কমিটির নথিতে তাদের স্বাক্ষর দেখা যায়।

তালিকায় থাকা একজন সিনিয়র সাংবাদিক মাহবুব উল ইসলাম আলমগীর কমিটি গঠনের কয়েক মাস পর মারা গেছেন। তবুও নিয়মিত সভার নথিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে এগুলো স্বাক্ষর করছেন কে?

কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু খালেদ বুলু, সাংবাদিক হাসানুজ্জামান হাসান, এসএম জ্যাকিতুল্লাহ সরদার, ব্যবসায়ী জীতেন্দ্রনাথ মণ্ডলসহ কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া যায়।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত আট বছর থেকে তারা কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখেন না। সভার কোনো নোটিশও তারা পাননি। স্বাক্ষরের বিষয়ে তারা বলেন, এসব জালিয়াতি করেছে কর্তৃপক্ষ। সভায় আমরা যাইনি, স্বাক্ষর করব কীভাবে?

উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু খালেদ বুলু দেশের রাজনৈতিক পটভূমি পরিবর্তনের পর থেকে পলাতক।

সদস্য সাংবাদিক হাসানুজ্জামান বলেন, গত আট বছরে কমিটির কোনো সভার চিঠি পাইনি। বর্তমানে কমিটির অস্তিত্ব আছে কি না জানা নেই। আমার নামের স্বাক্ষর থাকলে কেউ জালিয়াতি করেছে। সাংবাদিক মাহবুব চাচা ২০১২ সালে মারা গেছেন, সে কীভাবে স্বাক্ষর করল? এসব জালিয়াতি। নিখুঁত তদন্ত হওয়া উচিত।

রোগী কল্যাণ কমিটির ব্যাংক হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংকে হিসাব খোলা হয়। এর পর থেকে প্রতিবছর সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলেও ১০ বছরের টাকার কোনো হদিস নেই।

ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা গেছে- ২০২৩ সালের ২৬ মে ১ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের ১৭ মে ৯০ হাজার টাকা, ৩ জুলাই ২০২৪ সালে ৫২ হাজার, ২৮ আগস্ট ২,৫০০ এবং ২০ এপ্রিল ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সবশেষ ব্যালান্স ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, ১৩ বছরে প্রায় ১৩ লাখ টাকার বরাদ্দ এসেছে—কোন কোন অসহায় রোগীর জন্য কত খরচ হয়েছে এবং রোগীকে কত টাকার ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তা জানা যায়নি।

কদমগাছী গ্রামের সুলতানা বলেন, সমাজসেবা অফিস তো বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিধবা ভাতা দেয়। কিন্তু গরিব রোগীর জন্য ওষুধ ও খরচ দেয়, তা আমরা জানি না। অফিস না জানালে আমরা কীভাবে জানব বা সেবা পাব?

সদর ইউনিয়নের আলেফা বেগম বলেন, আমার ঘরে একজন প্রতিবন্ধী ছেলে আছে। ও কোনো ওষুধ খরচ পায় না। তাহলে সরকার থেকে আমরা কী পাব?

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমিটির বরাদ্দ থেকে প্রায় ৫২ হাজার টাকার স্যালাইন সরবরাহ করা হয়েছে। এর বাইরে আগের কয়েক বছরে কী আসা-যাওয়া হয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানে না।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কানিস ফারহানা বলেন, স্যালাইন এসেছে। রোগীর চিকিৎসা ব্যয় আমরা পাইনি। কোনো রোগীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি না জানা নেই। সমাজসেবা অফিস ভালো বলতে পারবে।

অভিযোগ শুধু বরাদ্দ লুটপাট নয়, রোগী কল্যাণ কমিটির সভার নথিতেও প্রশ্ন উঠেছে। এক সদস্য মুসলিম হলেও তার বাবার নামের জায়গায় হিন্দু ব্যক্তির নাম লেখা আছে। এভাবেই ভুয়া কমিটি দিয়ে সরকারি বরাদ্দ লুটপাট করা হচ্ছে।

বদলগাছী সমাজসেবা অফিসের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন বলেন, আমি গত মাসে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। আগের বিষয় জানি না। এখন থেকে নিয়মিত কার্যক্রম হবে। তবে পূর্ববর্তী বরাদ্দের অর্থের সঠিক ব্যবহার কোথায় হয়েছে তার কোনো জবাব মেলেনি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন: বরাদ্দ গেল কোথায়?

উপজেলার বিভিন্ন দোকান, হাসপাতাল ও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে—১০ বছরের বেশি সময় ধরে বরাদ্দের তথ্য বাইরে আসেনি। ফলে প্রশ্ন উঠে— ১। বরাদ্দ কোথায় গেল?, ২। ভুয়া স্বাক্ষর করল কে?, ৩। সভা হয়েছে কোথায়?,,৪। রোগীরা সেবা না পেলে টাকার গন্তব্য কোথায়?

স্থানীয় জুলাইযোদ্ধা শুভ বলেন, এটা সংবেদনশীল খাত। রোগীর চিকিৎসার টাকা হাওয়ায় যাওয়া মেনে নেওয়া হবে না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তীব্র আন্দোলন হবে।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।

সচেতন মহল মনে করছেন, অসহায় রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের অনিয়ম সরাসরি জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দ্রুত তদন্ত অপরিহার্য।