প্লেনে চড়ে আমাদের তো আর হুট করে পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টায় নওগাঁ শহরের এটিএম মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা যে সকল দাবি করলেন, তাহলে দীর্ঘ ১৭ বছরে কী হয়েছে? কিছু মেগা প্রকল্পের নামে হয়েছে মেগা দুর্নীতি। আমরা হুট করে উড়াল দিতে পারবো না। আমরা দেশে আছি, দেশ আমাদেরই গড়তে হবে।’
নওগাঁবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি এখানে শীতে এসে কম্বল দিয়েছি। নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘এখানে এসে শুনছি শুধু দাবি আর দাবি। এত দাবি থাকলে গত ১৭ বছরে কী হয়েছে? এই সময়ে কি উন্নয়ন হয়নি? আমরা যেহেতু এই দেশেই থাকবো, কাজেই আমাদেরই এই দেশের উন্নয়ন করতে হবে। প্লেনে চড়ে আমাদের তো আর হুট করে পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের সামনে নওগাঁ ও জয়পুরহাট জেলার ৮ জন বিএনপি প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এরা নির্বাচিত হয়েই এলাকায় কাজ করবে। কাজেই আপনাদের এলাকার দাবি ও সমস্যা যারা দেখবে, তাদেরই নির্বাচিত করবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘নওগাঁ জেলা ধানের ভাণ্ডার। এখানে বছরে তিনটি ধান উৎপাদন হয়, যা জিয়াউর রহমানের আমলে বরেন্দ্র প্রকল্প চালুর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। আমাদের প্রধান পেশা কৃষি। তাই কৃষকদের ভালো রাখতে হবে এবং তাদের সুবিধা দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘মরহুমা খালেদা জিয়া ৫ হাজার টাকা কৃষিঋণ মওকুফ করেছিলেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে। শুধু ঋণ মওকুফ নয়, আমরা কৃষকদের কৃষি কার্ড দেব। এই কার্ড দিয়ে একটি ফসল উৎপাদনের সব উপকরণ কৃষক সংগ্রহ করতে পারবে, যাতে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারে।’
প্রধান অতিথি বলেন, ‘নওগাঁ এখন আমের জন্য বিখ্যাত জেলা। কিন্তু পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আম নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য রেললাইন সংযোগের দিকে আমরা গুরুত্ব দেব, যাতে স্বল্প সময়ে ও কম খরচে কৃষকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে আম পাঠাতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেয়েদের পড়াশোনা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। আর ছেলেদের খেলাধুলার জন্য আলাদা পরিকল্পনা আছে। শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হলেই সাফল্য আসে না, খেলোয়াড় হয়েও দেশের সুনাম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব।’
গ্রামের মা ও শিশুদের জন্য হেলথ কেয়ার সেবার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘরে বসেই যেন ছোটখাটো অসুখের চিকিৎসা পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থাও করা হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘শিক্ষিত তরুণদের জন্য কৃষিভিত্তিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। যারা কলকারখানা স্থাপন করবে, তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। আইটিতে দক্ষদের জন্যও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকবে। সর্বোপরি সব শিক্ষিত ও বেকারদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ‘মসজিদ ও মাদরাসার খতিব-মোয়াজ্জেমসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিতদের জন্যও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।’
উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের দাবি পূরণ করব। কিন্তু আপনারা কি করবেন? ১২ তারিখে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে জয়ী করবেন।’ এ সময় নেতাকর্মীরা হাততালি ও স্লোগান দিলে তিনি বলেন, ‘‘আমার সামনে তাফালিং করে লাভ নেই, ১২ তারিখ ভোটের দিন দেখা যাবে।’
নেতাকর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। এক পক্ষ চলে গেছে, আরেক পক্ষ রয়ে গেছে। তারা পালিয়ে যাওয়াদের সহযোগী। বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করছে, তাই সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘তাহাজ্জুদ পড়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বসে থাকবেন। ভোট শুরু হলে ভোট দেবেন। তবে লাইন যেন নড়ে না, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘১৭ বছর পর দেশে এসে শুনছি গত ১৬ বছরে তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। ঢাকায় কিছু মেগা প্রকল্প হয়েছে, আর মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি। আমরা শহরের পাশাপাশি গ্রামকেও উন্নত করতে চাই। কারণ গ্রামের উন্নয়ন হলেই দেশের উন্নয়ন হবে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের ত্যাগের মূল্য দিতে হবে। এই আন্দোলনের কারণেই ভোটের অধিকার ফিরেছে, ফ্যাসিস্ট পালিয়ে গেছে। পরিবর্তন আনতে হলে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নু এবং সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন নওগাঁ-১ আসনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ-২ এর শামসুজ্জোহা খান, নওগাঁ-৩ এর ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-৪ এর ডা. ইকরামুর বারী টিপু, নওগাঁ-৫ এর জাহিদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ-৬ এর শেখ রেজাউল ইসলাম, জয়পুরহাট-১ এর মাসুদ রানা প্রধান ও জয়পুরহাট-২ এর আব্দুল বারী। এছাড়া বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও নওগাঁ পৌরসভার সাবেক মেয়র নজমুল হক সনি এবং রাজশাহী বিভাগের নেতা ওবায়দুল হক চন্দন।
এ সময় প্রার্থীরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি গবেষণাগার, সান্তাহার-নওগাঁ-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেল যোগাযোগ, কমিউনিটি ক্লিনিক উন্নয়ন, নওগাঁ শহরে চার লেন সড়ক বাস্তবায়ন ও গ্যাস সংযোগের দাবি তুলে ধরেন।
নওগাঁ ওলামা ইসলামের সভাপতি মুফতি ইলিয়াস তুহিন বলেন, ‘যে দল জীবন্ত মানুষকে হত্যা করে এবং ভোটের নামে জান্নাতের টিকিট দিতে চায়, সে দল কখনো ইসলামের দল হতে পারে না। ১৯৭১-এর পর যখনই ওই দল হোঁচট খেয়েছে, তখনই বিএনপির হাত ধরে দাঁড়াতে হয়েছে। অথচ এখন তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে।’


-20260130085232.webp)

