শিল্প ও বন্দরনগরী নারায়ণগঞ্জে চলছে ভোটের ধামাকা। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। জেলার ৫টি আসনে কে জিতবে এই নিয়ে চায়ের টেবিল থেকে অফিসপাড়া পর্যন্ত আলোচনার অন্ত নেই। ভোট চেয়ে প্রার্থীদের দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি ভোটাররাও উপভোগ করছেন। প্রচারে যুক্ত হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারসহ নানা কৌশল। আওয়ামী লীগবিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ৫টি আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি বনাম অন্য দল কিংবা বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসন ব্যতীত অন্য ৪ আসনে বিএনপি ও তাদের জোট প্রার্থীদের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে- এমনটাই আভাস দিচ্ছে ভোটার ও দলসংশ্লিষ্টরা।
এবারে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি আসনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ (সিটি করপোরেশন-বন্দর) আসনে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সদরের ২টি ইউনিয়ন) আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মনির হোসাইন কাসেমী খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের ময়দানে আছেন।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জে ২৩ লাখ ৬৬ হাজার ২৩২ জন ভোটার। তাদের মধ্যে পুরুষ ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৯২৯ জন ও নারী ১১ লাখ ৬৭ হাজার ২৮৩ জন। এ ছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২০ জন।
দলীয় কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নারায়ণগঞ্জ-২, নারায়ণগঞ্জ-৩ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন চারটি। এই চারটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও অন্য প্রার্থী শক্ত অবস্থানে থাকায় বিএনপি ও জোট প্রার্থীর জয়-পরাজয় নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও তিনি তেমন আলোচনায় নেই। যে কারণে এই আসনে বিএনপি নির্ভার। তবে অন্য চারটি আসনে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী, বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শক্ত অবস্থানে থাকায় বিএনপি প্রার্থীদের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দীপুকে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন। এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. দুলাল (জাহাজ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আনোয়ার হোসেন মোল্লা (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. ইমদাদুল্লাহ (হাতপাখা), সিপিবির মনিরুজ্জামান চন্দন (কাস্তে), গণঅধিকার পরিষদের ওয়াসিম উদ্দিন (ট্রাক) ও ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. রেহান আফজাল (আপেল)। তবে সবাইকে ছাপিয়ে দীপু ভূইয়া এই আসনে জয়ী হবেন এমনটাই আশা করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) বিএনপি প্রার্থী করেছে আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে থাকা নজরুল ইসলাম আজাদকে। তবে বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী আতাউর রহমান আঙ্গুর কলস প্রতীকে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তিনি এই আসনে তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন। এই আসনে অভিজ্ঞ আঙ্গুর বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হবেন তরুণ আজাদ। তবে আলোচনায় আছেন জামায়াতে ইসলামীর ইলিয়াস মোল্লাও (দাঁড়িপাল্লা)। এই আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন সিপিবির হাফিজুল ইসলাম (কাস্তে), গণঅধিকার পরিষদের কামরুল মিয়া (ট্রাক) ও ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মো. হাবিবুল্লাহ (হাতপাখা)।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোঁনারগাও-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে। এই আসনে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন (ফুটবল) ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী রেজাউল করিম (ঘোড়া) প্রতীকে লড়ছেন। দুই অভিজ্ঞ বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় ধানের শীষের মান্নানকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই আসনে আরও আছেন জামায়াতের ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া (দাঁড়িপাল্লা), গণসংহতি আন্দোলনের অঞ্জন দাস (মাথাল), খেলাফত আন্দোলনের আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মসীহ (হাতপাখা), জনতার দলের আবদুল করিম মুন্সী (কলম), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. শাহজাহান (রিকশা), আমার বাংলাদেশ পার্টির আরিফুল ইসলাম (ঈগল) ও গণঅধিকার পরিষদের মো. ওয়াহিদুর রহমান মিল্কী (ট্রাক)।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনটি বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে জোট শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমীর হাতে। তিনি খেজুর গাছ প্রতিক নিয়ে লড়ছেন। কিন্তু এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. শাহ আলম (হরিণ) ও বিএনপির সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন (ফুটবল) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ায় খেজুর গাছের প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন থেকেও নির্বাচন করছেন। তবে সব ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে কিংমেকার হিসেবে পরিচিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক এই সহসভাপতি বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি এবার রিপাবলিকান পার্টি থেকে হাতি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। তিনি এ আসনে বেশ জনপ্রিয়। ভোটারদের মতে বিএনপির জোট প্রার্থী ও বিদ্রোহী দুই প্রার্থী মাঠের লড়াইয়ে থাকায় মোহাম্মদ আলীর বিজয়ের পথ সুগম হয়েছে। শিল্পাঞ্চল খ্যাত আসনটিতে শাহ আলমের অবস্থানও বেশ শক্ত। তবে জামায়াত জোট মনোনীত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিনও (শাপলা কলি) জয়ের ব্যাপারে বেশ মনোসংযোগ দিয়েছেন। আসনের অপর প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ইসমাইল কাউসার (হাতপাখা), বাসদের সেলিম মাহমুদ (মই), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন (রিকশা), জাসদের মো. সুলাইমান দেওয়ান (মশাল), সিপিবির ইকবাল হোসেন (কাস্তে), গণঅধিকার পরিষদের আরিফ ভূঁইয়া (ট্রাক), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সেলিম আহমেদ (একতারা) ও জাতীয় পার্টির সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা (লাঙ্গল)।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনি বয়স্ক হলেও অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ শক্ত। বন্দর উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন ফুটবল প্রতীকে লড়ছেন। তিনি ধানের শীষের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। এ ছাড়া জামায়াত জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের এ বি এম সিরাজুল মামুন দেয়াল ঘড়ি নিয়ে মাঠে আছেন। একজন শিক্ষক ও ভালো মানুষ হিসেবে সিরাজুল মামুন আলোচনায় আছেন। এই আসনটিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার ব্যাপারে ফ্যাক্টর হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই আসনে অন্যান্যরা হচ্ছেন গণসংহতি আন্দোলনের তারিকুল ইসলাম সুজন (মাথাল), ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী (চেয়ার), ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাছুম বিল্লাহ (হাতপাখা), বাসদের আবু নাঈম খান বিপ্লব (মই), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের এইচ এম আমজাদ হোসেন মোল্লা (ছড়ি), সিপিবির মন্টু চন্দ্র ঘোষ (কাস্তে) ও গণঅধিকার পরিষদের নাহিদ হোসেন (ট্রাক)।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই জয়ের ব্যাপারে আমরা দৃঢ় আশাবাদী। আমরা এর জন্য ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নারায়ণগঞ্জে দুটি সমাবেশে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখায় কর্মী-সমর্থকরাও বেশ উৎফুল্ল। আমরা ৫টি আসনই তারেক রহমানকে উপহার দিতে চাই।

